About Me

I am like a pebble lying beside the road for ages. I observe and think. Sometimes I want things to be changed. But I am not an active person at all. So I just lie down and watch the play taking place around me. Somehow I enjoy the solitude I live in. I am happy with the package I came with. This beautiful earth, sunshine and rain…

Friday, February 26, 2010

ছবির কথা - ২ (The Old Guitarist - Pablo Picasso - 1903)


আজ ইনি এলেন আমার ঘরে। প্রথম কবে দেখেছিলাম? স্মৃতি বলছে নিউ ইয়র্কে – মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টস – সাল ২০০৭। মেটের লগবুক বলছে – ঐ সময় তো ইনি এখানে ছিলেন না। সেটাই নিশ্চয় সত্যি। অথচ মন বারবার বলছে পিকাসোর ব্লু-পিরিয়ডের এই নিদর্শনটি দিয়েই আমার ছবি ভালোলাগার শুরু। আজ সেই ছবির একটি প্রিন্ট স্থান পেয়েছে আমার ঘরের দেওয়ালে।

কি গাইছে এই বুড়ো গীটারবাদক? কাঠির মত হাত-পা, নুয়ে পড়া ঘাড়, চক্ষু কোটরাগত, ছেঁড়া জামার ফাটল হাঁ করে আছে কাঁধের কাছে – তবু সে গান গায়! কি গান গায়? জীবনের কোন অতল থেকে রস নিঙড়ে আনে সে?

তার কাছে গিয়ে শুনি সে বিড়বিড় করছে – “কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না – মোহ মেঘে – অন্ধ করে রাখে – তোমারে দেখিতে দেয় না – মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?” ধুলোভরা রাস্তার একপাশে বসে সে বারবার অবুঝ আবেগে প্রশ্ন করে – “চিরদিন কেন পাই না?” পথচারী হেঁটে যায়। কেউ উপেক্ষায়, কেউ উপহাসে। মাঝেমধ্যে দয়ার মুদ্রা ছুঁড়ে দেয় কেউ কেউ। তার কোন বিকার নেই। তার যে মস্ত অভিমান। তার মস্ত দুঃখ। সে তো প্রানপনে চায়। কিন্তু সাধ্য কই! হয় না, হয় না। কিছুতেই হয় না। তার চোখের গুহায় নৈরাশ্যের হলকা। তার গালভাঙা শীর্ণ মুখে জমাট অভিমান। “এতো প্রেম আমি কোথা পাবো নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে”। এইটুকু ভাঙাচোরা পাঁজরায় কোথায় রাখবো তোমায়? কোথায় বসাবো? কেমন করে বইবো? তুমি আপনি না এলে? এই গানটুকু সর্বস্ব করে পথে নেমেছি তাই। আমার শরীরে ধুলো, বসনে ধুলো, মরমে ধুলো – ধুলোমাখা আমি ধুলোর মধ্যে তোমায় খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে অন্ধ হয়ে যাই। তবু খুঁজে বেড়াই। নেশাতুরের মত। একটি বার কাছে এসো। নাও আমায়...

ছবির কথা - ১ (The Girl with Pearl Earring - Johannes Vermeer)

[এই ছবিটি প্রিয়তম ছবিগুলির মধ্যে পড়বে না। তবে একটি অর্কুট কমিউনিটিতে ছবির গল্প লিখতে গিয়ে এই ছবিটিকে বেশ ভালোবেসেই ফেললাম।]


এই ছবিটা দেখলেই মনে হয় মেয়েটা যেন কারোর জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু সে কবে আসবে বা আদৌ আসবে কিনা তা মেয়েটির জানা নেই। অনেকদিন আগে মেয়েটা তাকে দেখেছিল। সে হয়তো লক্ষ্যও করে নি মেয়েটিকে। কি ভাবেই বা করবে। মেয়েটার না আছে তেমন চোখে পড়ার মত চেহারা। না পারে সে ভালো করে কথা বলতে। সত্যি বলতে কি কোন কাজই তেমন গুছিয়ে করার ক্ষমতা মেয়েটির নেই। রোজ সকালে উঠেই যে তার মনে হয় - আজ হয়তো সে আসবে - অনেকদিন আগে শোনা একটা গলার আওয়াজ মনে পড়লেই বুক ছলাত করে ওঠে - এই সোজা কথাটাই কি সে স্বীকার করতে পারে কারোর কাছে! মুক্তোর দুলটা ওর মায়ের। ওর একমাত্র দামী জিনিস। এককালে সে রোজ যেত এই পথ দিয়ে। একটা কালো টয়োটা করোলাতে। রকির কোলঘেঁষা এই একহারা শহরের ঘুপচি কফিশপে এককাপ কফি খেত। এদিকেই কোথায় যেন ছিল তার ইউনিভার্সিটি। তারপর বহুদিন কেটে গেছে সে আর আসে না। মেয়েটা জানে তার কাজ ফুরিয়েছে, সে আর আসবে না। তবু ভোরের আলো জানলার বাইরের ম্যাপল পাতাগুলো ছোঁয়া মাত্র তার মন বদলে যায়। কত কিছুই তো অসম্ভব ঘটে জগতে। হতেও তো পারে আজ তেমনই এক অসম্ভব দিন। 'আসবে/আসবে না' 'আসবে/আসবে না' - বুকের ভেতর লাবডুব চলতে থাকে - সে কাঁপাকাঁপা হাতে পরে নেয় তার মুক্তোর দুল। কফিশপের ঝাঁপ তোলে। বেলা গড়ায়। কাউন্টারে রাখা ডার্ক রোস্টেড কলাম্বিয়ানটা ফুরিয়ে আসে। মেয়েটি অভ্যস্ত হাতে গ্রাইন্ড করতে থাকে সুগন্ধী কফিবিন। একটা কালো গাড়ী এসে দাঁড়ালো বোধহয়। সে চকিতে মুখ ফেরায়। কানের মুক্তোটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে...

Sunday, January 31, 2010

আমার বিচ্ছিরি এক তারা

[একটা অর্কুট কমিউনিটিতে লেখা কিছু এলোমেলো ভাবনার কোলাজ]

‘তুমি পুষে রাখো পাঁজরাতে চোরা মফস্বল’


শহর নয়। লিখবো এক গ্রামের কথা। একটা অথবা অনেকগুলো গ্রাম। সেই সব গ্রামগুলি – যারা মাঝে মাঝে এসে ভীড় জমায় দিনের শেষে ঘুম না আসা চোখে – আমার ছেঁড়াখোঁড়া স্বপ্নে। অফিস ফেরতা যানজটের ভিড়ে যখন লাল সূর্যটাকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখি – আমার আজকের দিগন্ত মিশে যেতে চায় সেই সব ফেলে আসা দিগন্তে। সেই সব পুরোনো বিকেল – আজ তারা এতো দূরে – ভালো বুঝতে পারি না তারা স্বপ্ন ছিল নাকি সত্যি।


আমাদের গঙ্গার কোল ঘেঁসা ছোট্ট মফস্বল শহর – হাওড়া থেকে আসা সবুজ ট্রেন বুড়ি ছুঁয়েই আবার ছুটে যেত পরের গন্তব্যে। কেউ চেনে না, কেউ জানে না। স্টেশন চত্তরের কিছু ছোট ছোট দোকান। সরু গলি। পানা ঢাকা নিথর পুকুর। পুকুরধারের পলেস্তারা খসে যাওয়া ইঁট বেরিয়ে পড়া বাড়ির সারি। ‘কোথায় থাকো’ – এই প্রশ্নের উত্তরে চিরকাল তো বলে এসেছি ‘বৈদ্যবাটি’ – তারপর প্রশ্নকর্তার দিশাহারা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে – ‘ওই যে শ্রীরামপুর! তার পরের পরের স্টেশন। আর কটা স্টেশন পেরোলেই চন্দননগর। জগদ্ধাত্রী পুজো হয় – বুঝলেন না? সেই যে বিখ্যাত আলোর কাজ!’


‘ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি, ক্ষিধের থেকেও স্পষ্ট’


সেই সব দিনগুলো কেমন সব রঙীন আলো দিয়ে ঘেরা থাকতো। কাকডাকা ভোরের নীলচে আলো। পুব আকাশে হীরের নাকছাবির মত জ্বলজ্বলে শুকতারা। এখনো মাঝে মাঝে খুব ভোরে ঘুম ভাঙলে জানলার ব্লাইণ্ডের ফাঁকে তাকে লুকোচুরি খেলতে দেখে সে। রাস্তা দিয়ে হুসহাস গাড়ি চলে যায়। সে কমফর্টারটা জড়িয়ে দু-মিনিট চেয়ে থাকে। নতুন দেশ, নতুন রাস্তা আর আকাশের গায়ে ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকা তার চিরকালের সাথী। বাংলাদেশের ভোরের গন্ধ নাকে এসে লাগে। বাগানভরা ফুল – জবা, কলকে, টগর, দোপাটি, নয়নতারা। ‘-‘কাকীমা তাদের বাগান থেকে ফুল নেয় তা জানে পাড়াসুদ্ধ লোকে। তবুও সে চোরের মত আসবেই – ঘাপটি মেরে। গাছ ঝাঁকিয়ে, আঁকশি বাড়িয়ে নানা কসরতে চলতে থাকবে তার প্রভাতী রোমাঞ্চ। ওদিকে জেগে উঠতে থাকবে পাড়া। সন্ধ্যাপিসি সদর দরজার সামনে একবালতি জল ঢেলে নারকোলের ঝাঁটা হাতে রাস্তা পরিস্কারে লেগে যাবে। মুখভরা কোলগেটের ফেনা নিয়ে তার সাথে বকবক করবে কালু কাকা। চক্রবর্তীদের বাড়ি চালিয়ে দেওয়া হবে আকাশবানী কলকাতা। সুজলাং সুফলাং শস্যশ্যামলাং বাংলা বিন্দু বিন্দু ছড়িয়ে পড়তে থাকবে মজ্জায় মজ্জায়। বহুদিন পর বহুদূর দেশের কোন এক সকালে কেউ একজন ভাববে – সবই তো সেই আগের মতই – সেই শুকতারা – সেই কমলা সূর্য – সেই ঘাসের গোড়ায় জমে থাকা শিশির – বাগান আলো করে ফুটে থাকা টিউলিপ, ড্যাফোডিল – আছে তো সবই। তবু কি যেন নেই! কি যেন নেই!!


‘আমার চোখ বেঁধে দাও আলো, দাও শান্ত শীতলপাটি’


ভোরের রঙ যদি নীল হয়, দুপুর তবে সবুজ। শ্যাওলা সবুজ। গরমের ছুটির ঝিম ধরা দুপুরে সারা পাড়া শুনশান। অনেকক্ষন আগে টহল দিয়ে যাওয়া ফেরিওলার হাঁক – ‘ইয়ে-য়ে-য়ে লোহা-(ভা)আআঙাআ (বো)ওতল-(ভা)আআঙাআ (বি)ইক্রি-ই-ই-ই-ই’ রোদজ্বলা রাস্তায় পাক খেতে খেতে মিশে গেছে। পোষা নেড়ীটাও তার সন্তানসহ খানিক ঝিমিয়ে নিচ্ছে পাঁচিলের পাশের এক চিলতে ছায়ায়। ঘুম নেই শুধু একজনের। কাঁঠাল গাছের বড় পাতাটার নিচে বসে সে ক্লান্তিহীন উত্থানপতনহীন অদৃষ্টবাদী সুরে ডেকে চলে। যেন জগতে কারো কোন কাজ নেই আর। যেন পূর্বজন্মের, তার আগের জন্মের, আরো আরো সব জন্মের সব কথা তার মনে পড়ে গেছে। যেন এই এলোমেলো পথ চলা, জীবনের পর জীবন বেয়ে চলা - সব তার বোঝা হয়ে গেছে। তাই সে ডেকেই যাচ্ছে। চক্রাকারে। অবিশ্রান্ত। সেদিন সে ডাক যে শুনলো তার জীবনের প্রতিটি অনাগত দুপুরের নিঃশর্ত মালিকানা কিনে নিল ওই বিরামহীন ঘুঘুডাক। কাঁঠালপাতার আলোছায়া ছেড়ে সে ডাক গিয়ে মিশলো চ্যাটার্জীপাড়ার স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তায় – বুড়ো শিবতলার ফাটলধরা চাতালে – কুমোরপল্লীর কাঁচা মাটির ভাঁড়গুলোতে একবার পাক খেয়ে নিয়েই সে ছুটে গেল খালপাড়ের বাঁশঝাড়ে। সেখানে তখন বৃষ্টি নেমেছে। নারকেল আর সুপারী গাছগুলো তাদের কোমরছাপা চুলের ভারে আলুথালু। কৃষ্ণদা নীল প্লাস্টিকের ঝাঁপটা ফেলে দিয়েই জোরে প্যাডেল চাপে স্টেশন রোড ধরে। বড় বড় জলের ফোঁটা খালের সবুজ জলে নুপুরের মত নাচতে নাচতে এগিয়ে যায়। ক্লাসঘরে তখন সুপ্রিয়াদি কুবলাই খাঁর রাজ্যবিস্তার বর্ণনা করছেন। দমকা পুবে হাওয়ার সাথে এক ঝলক ছাতিম ফুলের গন্ধ এসে কুবলাই খাঁর ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে।


‘বসন্ত বিকালখানি মেঘে রোদে অভিমানী’


দুপুরশেষের আলো ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে দেয়ালের গায়ে নকশা আঁকতো। ওদিকে কেরোসিনের স্টোভে তখন চা বসেছে। বিকেল মানেই চা আর কেরোসিন মেশানো এক কস্তুরী গন্ধ। কোলাপসিবল গেট লাগানো এক চিলতে সিঁড়িতে বসে বউ-ঝিদের গল্প। ধুলোমাখা পায়ে ফুটবলে লাথি। দমভরা কবাডি। অথবা উত্তাল কুমীরডাঙা। আর যে মেয়েটা কিছুই পারে না – যে কিনা একেবারেই এলেবেলে – তার জন্য আছে লুচিপাতার রুটি, ধুলোবালির আলুরদম আর স্টোন চিপসের ফিশফ্রাই দিয়ে ভরাট সংসার। সাদা আর গোলাপী কৃষ্ণকলি ফুল দিয়ে বিনি সুতোর মালাগাঁথা। শনি-রবিবার যাওয়া যায় লাইব্রেরী। ছোটদের সেকশন থেকে নিয়ে আসা যায় আনন্দমেলা, কিশোরভারতী, শুকতারা। জোজো-সন্তু, ট্যাঁপা-মদনা, বড়মামা-মেজোমামা দুই ভাই, আক্কুশ নামের ছোট্ট ভুতটা – অনেক অনেক বন্ধু তখন। দেবসাহিত্য কুটিরের অনুবাদগুলো – লা মিজারেবল, কর্সিকান ব্রাদার্স, লাস্ট ডেজ অফ পম্পেই, টেল অফ টু সিটিজ – আরেকটু বড় হয়ে পড়া রেবেকা – সবার সাথেই জড়িয়ে আছে মরে আসা রোদের গন্ধ আর বাড়ির পাশে বেছানো রেললাইনের ঝমঝম শব্দ। দেড়তলার ছাদে বসে প্রথম আরন্যক পড়া। মেটে সিঁদুর রঙের সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে রেললাইনের ওপারে – নারকেল গাছের ফাঁকে। এরপরে সে যতবার আরন্যক পড়েছে লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গল এসে মিশেছে তাদের মফস্বল শহরের রেললাইনে, মিটিমিটি জ্বলে ওঠা ল্যাম্পপোস্টের বিষন্ন আলোয়, সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সন্ধ্যারতিতে। আর তারও বহু বহু দিন পর – যখন তার আরো অনেক অনেক শহর ঘোরা হয়ে গেছে – যখন তার কাছে এ সবই পূর্বজন্মের স্মৃতির মত ধোঁয়ায় ঢাকা লাগে – তখন সে একদিন দেখে তার জীবনের সব বিকেল এসে মিলেছে একটি বিকেলে – আইআইটি ক্যাম্পাসের বেগুনী ফুল বিছিয়ে আছে অ্যান আরবরের ঝরাপাতায়, কমলানগর মার্কেটের চাটের গন্ধে মাখামাখি হয়েছে ব্যাটলক্রীকের মনখারাপী রাস্তা, কালামাজুর গাঢ়যৌবনা হেমন্ত আবির ছড়িয়েছে সেন্টলুইসের সেন্ট্রাল পার্কে – আর এক আশ্চর্য হলুদ আলো আকাশ ধুয়ে, বাতাস ধুয়ে, শরীর ধুয়ে আচ্ছন্ন করছে তার সমস্ত চেতনাকে। তাদের গঙ্গাতীরের ইঁটভাঁটি থেকে ভেসে আসা সেই জাদুকরী আলো খেলে বেড়ায় তার বরফঢাকা পার্কিংলটে। সে খুব খুশী হয়ে ওঠে অকারনেই। আপনমনেই জোরে জোরে আবৃত্তি করতে থাকে ‘আমাদের এই গাঁয়ের নামটি অঞ্জনা, আমাদের এই নদীর নামটি খঞ্জনা, আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচজনে, আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা’ – রঞ্জন বা রঞ্জনা – কারোর তোয়াক্কা না করেই!


‘তুমি লোডশেডিং-এ চাঁদের আলোর স্বর’

মফস্বল শহরে সন্ধ্যা নামে কুন্ঠিত ভীরু পায়ে। রাস্তার হলুদ বাতি আলোর চেয়ে অন্ধকার ছড়ায় বেশি। পোদ্দারঘাটের বৈষ্ণবমঠ থেকে মৃদু কীর্তনের সুর ভেসে আসে। স্টেশনারী দোকানগুলো ধূপের ধোঁয়ায় আবছা ভুতের মত দেখায়। গেরস্তবাড়ীর শাঁখের আওয়াজ লাফিয়ে বেড়ায় এক ছাদ থেকে অপর ছাদে। তারই মাঝে চলে কিশোরী মেয়ের গলা সাধা। রান্নাঘরে তখন গরম রুটির গন্ধ। আর প্রতিটা সবুজ ট্রেনে ঘরে ফেরার সুর।

দুই ভাইবোন মায়ের সতর্ক প্রহরায় পড়তে বসতো। কোলগেটের সুরক্ষা বলয়ের মত ওদের ঘিরে থাকতো কচ্ছপ ধূপের কড়া গন্ধ। জ্যামিতির এক্সট্রাগুলো শেষ করে সবেমাত্র ত্রিকোনমিতি ছুঁয়েছে সে - লোডশেডিং হয় ঝুপ করে। বাবা ল্যাম্প জ্বালাতে যান। সে দৌড়ে এসে বসে তাদের বক্স জানলাটিতে। একফালি সেই জানলা তখন নারকোল পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া চাঁদের আলোয় মাখামাখি। অপ্রত্যাশিত এই প্রাপ্তিতে সে বড় বিভোর হয়ে যায়। মায়ের বকুনিকে পাত্তা না দিয়ে মহানন্দে চাঁদের আলোয় অঙ্ক কষতে থাকে আর ভাবে – ইসস যদি একটা ইউক্যালিপটাস গাছ থাকতো এখানে! তাহলেই তো জায়গাটা শিমুলতলা হয়ে যেত। সেখানে কেমন সন্ধ্যে হলেই ইউক্যালিপটাস গাছে থোকাথোকা জোনাকি ভীড় করে আসে। আকাশের তারাগুলোও মিটমিট করে জোনাকির মতই। সেই জ্যোৎস্নার আলোয় ছোটোনাগপুরের এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা বেয়ে তারা চারজনে ঘরে ফিরেছে কতবার। বিহারীবাবুদের বাগান থেকে ভেসে আসতো কোন এক রাতপোকার ঝুম ঝুম আওয়াজ।

পনেরো বছর পর – পৃথিবীর উল্টো পিঠে সে যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরতো হেঁটে হেঁটে – স্টেডিয়ামের পাশে শুনশান রাস্তায় অন্ধকার জমাট বেঁধে থাকতো – স্মৃতির কোন তলানিতে পড়ে থাকা সেই ঝুম ঝুম আওয়াজ তার পথ চলার সঙ্গী হত। অথবা সে যখন প্রথম একা থাকতে শিখছে – সেই সব দিনগুলোতে – তার ব্যাটলক্রীকের বাসায় কোন কোন গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় সে তার একচিলতে অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে এসে বসতো। নতুন শহর, ছোট্ট শহর, একহারা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কোনায় কোনায় ঝুপসি অন্ধকার। তার ভয় করতো খুব। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সে দেখতে পেত আকাশ ভরে চাঁদ উঠেছে। ভুসভুসে মেঘের মধ্যে থেকে উঠে আসা গরদ রঙের সেই চাঁদ দু’হাত ভরে নিয়ে এসেছে তার কিশোরীবেলার সন্ধ্যে – বেলফুলের গন্ধ ভরা তাদের দেড়তলার ছাদ – টেবিলল্যাম্পের আলোয় বাবা-মা হায়ার সেকেন্ডারীর খাতা দেখছে – ভাই-এর মুখ গোঁজা কিশোরভারতীতে – আর তার তখন প্রথম রবীন্দ্রনাথে হাতেখড়ি। বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসা এই ভয়ভাঙানীয়া গন্ধকে আকন্ঠ পান করে সে। বহুদিন যার খোঁজ করে নি, যেসব দিন সে ভুলেই ছিল - এই নিঝুম সন্ধ্যায় সেই অনাহুতকে আঁকড়ে ধরে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।


‘তাকে যেই কাছে পাই খুব – পাছে যাই ভেসে, দিই অন্য হাওয়ায় ডুব’

প্রেম আসলে কোন সম্পর্কের নাম নয় – প্রেম কিছু মূহুর্তের সমষ্টি মাত্র। কিন্তু প্রেম বড় ভয়ংকরী। সুযোগ পেলেই আঠালো লালায় আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করে নিতে চায় তার শিকারকে। প্রেম বড় মায়াবী। বার বার অনাদর সয়েও ঘরের চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে বেহায়া অবুঝ ছেলের মত। প্রেম এক সদাপ্রসন্ন কিশোর। তাকে ফেলে বহুদূরে চলে এলেও কোন এক হঠাৎ খুশীর ভোরে সে নীলকন্ঠ পাখীর পালক ফেলে রেখে যায় শিয়রের কাছে। বৃষ্টিধোয়া সূর্যস্নাতা সেই সব ভোরে বড় সাধ হয় কৌটোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা সেই পরশমনিটিকে আরেকবার ছুঁয়ে আদর করতে। তরুন সূর্যের আলো সেই মনিতে ঝিলিক দিয়ে সাতরঙা ছবি আঁকে। বুকের গভীরে পুষে রাখা মফস্বলের ছবি দেখবো ভেবে আসলে দেখি কে জানে কবে আমার আকাশলীনা গঙ্গায় এসে মিশেছে অ্যান আরবরের তারাভরা ভো্‌র, পশ্চিমঘাটের বেপরোয়া চিকন সবুজ বৃষ্টি, ব্লুমিংটনের বিষন্ন বিকেল, সেন্ট লুইসের গেরস্থালী সন্ধ্যা, পাওয়াই লেকের উদাত্ত রাত্রি। আমার প্রেমিক কিশোরের অভিমানী মুখ উপেক্ষার অপমানে মূহুর্তের জন্য নীল হয়। কিন্তু সে এক নাছোড়বান্দা রাখাল বালক। তার মোহনবাঁশীর সুর সে ছড়িয়ে দেয় সারা পৃথিবীর আকাশে বাতাসে চেতনায়। সমস্ত অনাগত দিনগুলিতে। তাকে ফেলে যাবো – আমার সাধ্য কি!

Saturday, August 8, 2009

ব্রাইস-জায়ন-ইয়েলোস্টোন

৮ই অগাস্ট, ২০০৯ – ভোর ৫:৪৫ - ব্লুমিংটন

আজ বেড়াতে যাচ্ছি অনেকদিন পর। আলাদা করে বলার মত কিছু নয়। তবে তিরিশ বছরের জীবনে এই প্রথম একদম নিজের খেয়ালে একা একা বেরোনো। সেদিক দিয়ে একটা গুরুত্ব আছে বইকি। ভোরের ফ্লাইট ভাল্লাগে না। কিন্তু উপায় কি! ৬:১৫তে ফ্লাইট। ভেবেছিলাম সোয়া চারটে নাগাদ উঠলেই হবে। কিন্তু বিধি বাম। সোয়া তিনটেয় বেড়েপাকা আমেরিকান এয়ারলাইন্স এসেমেস করে ঘুম ভাঙিয়ে দিল। আর কি ঘুম আসে। চারটে পর্যন্ত চোখ চেপে শুয়ে থেকে হাল ছেড়ে দিলাম। চান করে কফি পানান্তে সাজুগুজু করতে করতেই ক্যাব এসে গেল। বুড়ো ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে লাস ভেগাসে জুয়ো খেলতে যাচ্ছি কি না! নারে ভাই, ছাপোসা মফস্বলী বালিকা, জীবনে প্রথম একা বেড়াতে যাচ্ছি – তাও এই তিরিশ বছর বয়সে। জুয়ো খেলার সাহস কোথায়! আপাতত ব্লুমিংটন এয়ারপোর্টে বোর্ডিংযের অপেক্ষায়। ফির মিলেঙ্গে ব্রেক কে বাদ।

৮ই অগাস্ট, ২০০৯ – সকাল ৮:০০ – আকাশপথে

ব্লুমিংটন থেকে শিকাগো প্লেন রাইড হগওয়ার্টসের ভাষায় অ্যাপারেট করার মত। ফ্লাইট টেক অফ করলো ৬টা ২০ নাগাদ। আর ৬টা ৩৮শেই পাইলট সাহেব ঘোষনা করলেন – ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গন, আপনারা কুর্সিবন্ধনে আবদ্ধ হউন। আমরা অবতরন করিব। ল্লেহ! খুললাম কখন যে বাঁধব!!

এক একটা দিন অদ্ভুত ভাবে আসে। এর আগেও তো কতবার ভেবেছি ইয়েলোস্টোনে যাওয়ার কথা। যবে থেকে আমেরিকা এসেছি তবে থেকেই ভেবেছি। বারবার ভেস্তে গেছে। এবারেও তো ভেবেছিলাম আসা হবে না। কিন্তু জোর করে চলে এলাম। আমার রোজ রোজ মেলবাক্স চেক করায় বড় আলিস্যি। আমি ওটাকে ডেইলি রুটিনের জায়গায় উইকলি করে নিয়েছি। ফলে যখনই বাক্স খুলি কেজো-অকেজো চিঠির ভারে তা উপচে থাকে। কালও তেমনই একটা দিন ছিল। চাবি ঘোরাতেই পাপা জোন্স পিজ্জা, ওভেন বেকড স্যান্ডুইচ, বেড অ্যান্ড বাথের কুপন, নিকটবর্তি স্টেট ফার্ম এজেন্টের উপদেশাবলী ইত্যাদি অতীব গুরুত্বপূর্ন খেজুরের সাথে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের লেটেস্ট ইস্যু মাটিতে ঝরে পড়লো। অ্যান্ড গেস হোয়াট? এবারের কভার স্টোরী ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক। ফ্লাইটে বসে সেটাই পড়ছি।

“কখনো সময় আসে জীবন মুচকি হাসে
ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা
অনেক দিনের পর মিলে যাবে অবসর
আশা রাখি পেয়ে যাবো বাকি দু-আনা” :-)

৮ই অগাস্ট, ২০০৯ – দুপুর ২:৩০ – লাস ভেগাস

অবশেষে নষ্ট শহরে পা রাখা হল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই দেখি এক খানা গাম্বাট গীটার আকাশপানে চেয়ে আছে। দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। টাইম স্কোয়ারে ইহাকেই তো দেখিয়াছি হার্ডরক কাফেতে। তফাত একটাই। টাইম স্কোয়ারে যাকে নিউ ইয়র্কের জীবনের স্পন্দন মনে হয়েছিল এখানে সেটাকেই নির্লজ্জ বেলেল্লাপানার বেহায়া টুকলি মনে হল। তবে গোটা লাস ভেগাস শহরটাই তো নকলে ভরা। হাতে কিছু সময় ছিল। আমার অফিস কলিগের রেকমেন্ডশনে গেলাম ভেনিশিয়ানে। ইটালীর ভেনিসের অনুকরনে নাকি এই হোটেল তৈরী। কিছু ক্যানাল, কিছু সোনালী বর্ডার দেওয়া সাদা সেতু আর সিলিং জোড়া রেনেসাঁ পেইন্টিং-এর অক্ষম অনুকরনে যা তৈরী হয়েছে তার নাম যদি ভেনিস হয় তাহলে আর ইহজীবনে আসল ভেনিস দেখে আমার কাজ নেই। যে কোন শিল্প – বিশেষ করে তা যদি আর্কিটেকচার হয় – তার সাথে পারিপার্শ্বিকের মেলবন্ধন খুব জরুরী। মিশর থেকে একটা ওবেলিস্ক খুলে এনে প্যারিসের রাস্তায় লাগিয়ে দিলে যেমন তার শোভা বাড়ে না, তেমনি ব্যস্ত চৌরাস্তায় পৃথুলা স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে তৃতীয় শ্রেনীর কার্টুন মনে হয়। তার চেয়ে বরং ক্যাসিনোগুলো ভালো। এর আগে তো শুধু সিনেমাতেই দেখেছি। ঘরভর্তি সারি সারি স্লট মেশিন, পোকার টেবল এবং আরো যেগুলোর আমি নাম জানি না – সেসব দেখে বেশ রোমাঞ্চিত হলাম। এমনকি দানী হতচ্ছাড়ার পাল্লায় পড়ে সকালের উপলব্ধি ভুলে একটু জুয়াও খেলে নিলাম। আসলে আপত্তিটা জুয়ো নিয়ে নয়। আমার মফস্বলী জেনেটিক ডিসঅর্ডার আমাকে ছোটোবেলাতেই জানিয়ে দিয়েছে আমি একটি ট্যালা এবং সারা পৃথিবীর মানুষ অপেক্ষা করে আছে কখন আমি একটি ট্যালামি করব আর তারা প্রান ভরে আমায় দেখে হাসবে। ক্যাসিনোতে কি ভাবে খেলতে হয়, কোথায় টাকা ঢোকাতে হয় কিছুই তো জানি না। কিছু একটা কেলেঙ্কারী করি আর হাসির খোরাক হই আর কি! কিন্তু এহেন সরল স্বীকারোক্তিতে আমার সাহসিকতার ঝুঁটি ধরে টানাটানি শুরু হয়ে গেল। আর সাহসে কটাক্ষপাত হলে খাঁটি বাঙালী রক্তে কেমন আলোড়ন ওঠে তাতো জানেন ঈশ্বর এবং ক্ষুদিরাম বোস। তার ওপর জানা গেল এমনকি দেবপ্রিয়াও স্লট মেশিনে খেলেছে। এখানে একটা কথা বলে নিই। দেবপ্রিয়া যদিও আমার থেকে হাজার গুনে স্মার্ট কিন্তু বালুরঘাটের মেয়ে বলে আর আমার মতই আর্মানির স্যুট অথবা গুচ্চির ব্যাগ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয় বলে আমি মাঝে মাঝেই ওকে আমার সমগোত্রীয় ভেবে নিই। তাই দেবপ্রিয়ার পরামর্শ মত পাকড়াও করলাম এক কালো স্যুট পরা অ্যাটেন্ডেন্টকে আর সমস্ত মফস্বলী জড়তাকে পেন্নাম ঠুকে তাকে জানিয়ে দিলাম আমি এক নাদান বালিকা। কিন্তু জুয়ো খেলার বড় শখ। এখান তিনি যদি একটু সাহায্য করেন। কালো স্যুট মধুর হেসে বলল – তা কি খেলতে চাও তুমি? বোঝো! সেটাই যদি জানবো তাহলে তোমাকে জিগালাম কেন। সে বোধহয় এমন জিনিস এর আগে দেখে নি। সংশয়ান্বিত চোখে সে আমার আই ডি দেখতে চাইল। লজ্জার মাথা খেয়ে তাও দেখালাম। জুয়ো না খেলে আজ আমি ঘরেই ফিরব না। আমার তিরিশ বছরের সঞ্চিত নির্বুদ্ধিতা আপাদমস্তক জরীপ করে সে বলল – ফলো মি। আর কি ভাগ্যি তখনই তার ফোন বেজে উঠলো। আমাকে এক জ্যানিটারের হাতে সঁপে দিয়ে কালো স্যুট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আফটার অল জ্যানিটার তো আর স্যুট পরে নি। তাকে তবু অ্যাপ্রোচ করা যায়। সে জানতে চাইল – কত টাকার খেলবে? আমি একটি ডলার বাড়িয়ে দিলাম। জ্যানিটারই টাকা ঢোকালো আর দেখিয়ে দিল কি ভাবে খেলতে হবে। প্রথমেই হারলাম। পরের দানে অহো কি বিস্ময়! টাকা দ্বিগুন হল। কিন্তু ট্যালার ভাগ্যে আর কতই বা বিস্ময় জমতে পারে। পরপর ছ’বার খেলে এবং হেরে সব টাকা শেষ করে উঠে পড়লাম। যাক বাবা! লাস ভেগাসে এসে জুয়ো খেলিনি এই বদনামটা আর কেউ দিতে পারবে না!!

৮ই অগাস্ট, ২০০৯ – রাত ৯ঃ১৫ – সেন্ট জর্জ, উটা

অবশেষে বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ আমার ট্যুর গাইডের দেখা মিলল। ট্রপিকানা হোটেলের লবিতে হল মধুর মিলন। অবশ্য মধুর না কষায় সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কারন সে চীনদেশীয়। চাইনীজ সে কি ভাষায় বলে ঠিক বলতে পারবো না, তবে সে ইংরিজী বলে চিনে ভাষায়। অতএব বুঝ সে লোক যে জানো সন্ধান!

আপাতত সেন্ট জর্জ, উটাতে ঘাঁটি গেড়েছি। হোটেলের ঘর থেকে চমৎকার একখানা সুর্যাস্ত দেখে নিলাম। আমেরিকার এই অঞ্চলে যতবার আসি মুগ্ধ হই। এখানে প্রকৃতি পুরুষ। গঁগ্যার পেইন্টিং-এর মত রুক্ষ, প্রকান্ড পুরুষ। সারা দিনের শেষে সূর্যের নরম লাল সে দু-বাহু দিয়ে শুষে নেয়। বারবার দেখেও পুরনো হয় না। কাল যাচ্ছি জায়ন আর ব্রাইস ক্যানিয়নে। ভোরে উঠতে হবে। আজ এখানেই শেষ।

৯ই অগাস্ট, ২০০৯ – রাত ৮ঃ৩০ – সল্টলেক সিটি, উটা

আমার সহযাত্রীরা সকলেই এশীয়। তার মধ্যে আবার ষাট শতাংশ চাইনীজ। তবে আমি একা এসেছি শুনে সবাই আমাকে বেশ প্যাম্পার করছে। আর আমিও এই প্যাম্পারিং-এর সুযোগ নিয়ে “কাকু একটা ছবি তুলে দিন”, “বৌদি চলুন ওই ক্লিফটা থেকে ঘুরে আসি”, “গাইড-দা, এই জায়গাটা কি সুন্দর – এখানে একটা ফোটোস্টপ দিন” ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছি।

সকালে সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরোনো হল জায়ন ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে। জায়নে প্রথমেই নজর কাড়ে সবুজের সমারোহ। আমেরিকার এই অঞ্চলের অন্য কোন ন্যাশনাল পার্কে এত সবুজ দেখি নি। নাভাহো স্যান্ডস্টোনের বুক চিরে বয়ে গেছে ভার্জিন রিভার – সেই নদীই জায়নকে সবুজ করে রেখেছে। জায়নে যে জায়গাগুলোতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল সেগুলো চড়া রোদের আলোতে ভালো লাগার কথা নয়। জায়নে যাওয়া উচিত ছিল গোধুলির সময়। কিন্তু আমার ট্যুর আর সমস্ত মেড ইন চায়না প্রোডাক্টের মতই সস্তা এবং কমপ্লেইন্ট-রেজিস্টান্ট। তাই জায়নে বুড়ি ছুঁয়ে আমরা চললাম ব্রাইস ক্যানিয়নের পথে।

যাত্রাপথ বড় সুন্দর। দুদিকে যতদুর চোখ যায় ঢেউ খেলানো পেশীর মত রকির বিস্তার। কোথাও এক গোছা সবুজ ঐ রুক্ষতার থেকেই প্রানরস শুষে নিচ্ছে। আবার কোথাও নির্মম দাবানলের সাক্ষী রেখে গেছে ঝলসানো গাছের গুঁড়ি, এবড়ো-খেবড়ো প্রানহীন শিকড়। এই পথে আমি যখনই এসেছি আমার ছাপোষা জীবনের থেকে অনেক বড় কিছু এক অন্যতর জীবনের স্পন্দন টের পেয়েছি। ঘোড়ার খুরের ধুলো উড়িয়ে সূর্যাস্তের দিকে ছুটে যাওয়ার জীবন। কলোরাডো নদীতে উজান বাইবার জীবন। তারাভরা আকাশের নীচে ভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়ার সেই সব জীবন – যা আমার নাগালের অনেক বাইরে – এই রাস্তা আমাকে সেই জীবনে বড় প্রলুব্ধ করে।

ব্রাইস ক্যানিয়নে না এলে পৃথিবীর এক অনন্য সৌন্দর্য আমার চিরদিনের মত অধরা থেকে যেত। মাইলের পর মাইল জুড়ে কমলা-গোলাপী-হলুদ পাথরের সারি। আমি বৈজ্ঞানিক নই। এই পাথর - যার পোষাকি নাম হুডু - কি ভাবে এখানে এল তার অক্ষম ব্যাখ্যায় আমি যাবো না। দিগন্তবিস্তৃত প্রস্তর স্তম্ভ দেখে আমার মহাভারতের এগারো অক্ষৌহিণী সেনার কথা মনে পড়ছিল। কোটি কোটি বছর ধরে নির্জন সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক সৈনিকের দল। পাঞ্চজন্যের একটি ফুঁ তে যেন এখনই প্রান ফিরে পাবে। চড়াই ভেঙে খানিক উঠে একটা পাতাহীন গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসলাম। আমার সামনে দুই কোটি বছরের নিরন্তর কর্মশালায় তৈরী হওয়া এক নিখুঁত শিল্প। অবিশ্বাসী মন এইখানে এসে তাঁকে খুঁজে পায়।

মাটি জানবে তুমি আস্থার পায়ে দাঁড়িয়েছ তাই স্নিগ্ধ
তার জীবন স্তন্যে ধন্য
ধন্য হল বিশ্ব।

১১ই অগাস্ট, ২০০৯ – ভোর ৫:৩০ – ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক

ইয়েলোস্টোন ন্যশনাল পার্কের লগ কেবিনে বসে এই লেখা লিখছি। চারদিন শুনশান। নিস্তব্ধ। ঘন পাইনের সারির মধ্যে এই কটা কেবিন – যার একটায় আমি আছি। আমার জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে পাইনের বন নিকষ কালো দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে। সত্যি বলতে কি এমন জায়গায় যে আমাকে একা রাত কাটাতে হবে তা আমি আগে ভাবি নি। বাইরের পৃথিবীর থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন এই এলাকা। এমনকি যে 911 এর অটূট নিরাপত্তায় আমি এদেশে একা থাকি – তার ওপরেও আর ভরসা করতে পারছি না। আমার সেল ফোনে কোন সিগনাল নেই। কেবিনে নেই কোন ইন্টারকম। মিনিট সাতেক হেঁটে গেলে সার্ভিস ডেস্ক। এখন যদি একটি ভাল্লুক এসে আমার জানলায় নক করে তাহলে সার্ভিস ডেস্ক পর্যন্ত গিয়ে জানাতে পারলে তবে মিলবে সাহায্য। কোন সিগন্যাল না থাকার জন্যই বোধহয় আমার সেলফোন তার নিজস্ব লোকাল টাইমে সেট হয়ে গেছে। সাড়ে পাঁচটাতে অ্যালার্ম দিয়েছিলাম। উঠে স্নান করে তৈরী হয়েও দেখি বাইরের আঁধার একটুও ফিকে হয় নি। মনে হয় আমি জেগেছি সাড়ে চারটেতে। আর এখন বাজে সাড়ে পাঁচটা। নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই। কারন ঘরে কোন ঘড়ি নেই। আর যে ইন্টারনেট আমাকে রনে-বনে-জলে-জঙ্গলে উদ্ধার করে সেই পরম অগতির গতিও এখানে অচল। আমি এখন তাই ভোর হওয়ার অপেক্ষা করছি আর লিখে রাখছি গতকালের কথা।

কাল সল্টলেক সিটি থেকে বেরিয়েছি সাড়ে সাতটা নাগাদ। গাইড আমাদের প্রথমেই নিয়ে গেল উটার স্টেট ক্যাপিটালে। সুন্দর মার্বেলের বাড়ি – ওই যেমন হয় আর কি। কিন্তু আমার মন তো তখন উড়ে বেরাচ্ছে রকির আঁকে বাঁকে – হলুদ-সবুজ উপত্যকার অনাবিল মুক্তিতে। মর্মর সৌধে কি তখন মন ওঠে!
তারপরই সোজা ইয়েলোস্টোনের পথে। সর্পিল রাস্তা রকির বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। পাহাড়ের বুক-জোড়া সূর্যমুখীর ক্ষেত আকাশের দিকে চেয়ে হাসছে। কালো পাহাড়ের বুকে সবুজ পাহাড়, তার বুকে লাল পাহাড়, তার কোলে সোনালী চারনভূমি। ঠিক ছবির মত – ছোটোবেলায় ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতায় যেমন আঁকতাম। মাঝে মাঝেই ধরা দিচ্ছে স্নেক রিভার – সার্থকনামা নদী একটি – পাইনের জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে তরতর করে খরস্রোতে বয়ে চলেছে। লাঞ্চ করতে থামা হল জ্যাকসন হোলে। রকি দিয়ে ঘেরা একটি ছোট্ট শহর। সামান্য কয়েকটি রেস্টোর‌্যান্ট। আর সামান্য কিছু মানুষ। লাঞ্চের পর একটু হেঁটে বেড়ালাম। শহরের বড় রাস্তাটিকে বাদ দিলে বাকি ছোটো রাস্তাগুলোতে ট্রাফিক লাইট নেই। লোকজন এদিক ওদিক তাকিয়ে পরস্পরের সম্মতি নিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে। বেশ বন্ধুবৎসল শহর। আমাকে একবারও অপেক্ষা করতে হল না। গাড়িওয়ালারা মিষ্টি হেসে পথ করে দিল।

এর পরেই শুরু হয় গ্র্যাণ্ড টেটন ন্যাশনাল পার্ক – যা গিয়ে মিশেছে ইয়েলোস্টোনে। পার্কের শুরুতেই রকি পাহাড় অভ্যর্থনা করলো তার বরফে ঢাকা চুড়ো দিয়ে। রকি যে আসলে নেহাত এক সাধারন পাহাড় নয় – এ যে পর্বত – হিমালয়-অ্যাল্পস-আন্দিজদের জাতভাই তা তো প্রায় ভুলেই গেছিলাম কলোরাডো নদীর দাপটে। বরফের শৃঙ্গ সে কথা মনে করিয়ে দিল। তবে রকি ঠিক হিমালয়ের মত ধ্যানগম্ভীর নয়। তার হাবভাব অনেকটাই চ্যাংড়া ছোঁড়ার মত। সেই ফিচেল রকিকে পাশে নিয়ে আমাদের বাস চলতে থাকলো পৃথিবীর সব চেয়ে পুরোনো ন্যাশনাল পার্কের পথে।

১২ই অগাস্ট, ২০০৯ – ভোর ৪:০০ – ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক

কাল সারাদিন ধরে যা যা দেখলাম তা ভালো করে দেখার জন্য গোটা একটা জীবন ও বোধহয় যথেষ্ট নয়। লিখছি একে একে।

ইয়েলোস্টোন ভোরের দিকে বেশ ঠান্ডা হয়ে যায়। আমি একটা হাল্কা ফ্লিস জ্যাকেট সাথে এনেছি। সকাল বেলা সেটা গায়ে দিয়েও শীতে কাঁপছি। তবে ভোরবেলা পাইনের পথ ধরে হাঁটতে খুব ভালো লাগছিল। ছোটোবেলায় প্রায় প্রতি বছরই শিমুলতলা যাওয়া হত। কুয়াশা মাখা ভোরে চাদর জড়িয়ে কুঞ্জ-কুটীরে খেজুর রস খেতে যাওয়ার সেই সব দিন। বহুদিন পর আবার সেই রকম ভোরবেলা হাঁটতে বেরোলাম।

আমরা যেখানে আছি সেখানে ইয়েলোস্টোন রিভার রকির বুকে একটা ক্যানিয়ন তৈরী করেছে। সবাই বলে ইয়েলোস্টোনের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। বিশালত্বে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সাথে যদিও কোন তুলনাই হয় না, কিন্তু নদীটি যেখানে পাহাড়ের বুকে জলপ্রপাত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই সৌন্দর্য অতুলনীয়। খুব আফসোস হচ্ছিল ফোটোগ্রাফিটা ভালো করে শিখি নি বলে। কি আর করবো। স্মৃতির ক্যামেরাতেই গেঁথে নিলাম ছবিটি।

ফোটোগ্রাফির প্রসঙ্গ যখন উঠলোই তখন একটা গল্প করেই নিই। এখানে সবার ধারনা হয়েছে আমি খুব বড় ফোটোগ্রাফার। আমি যতই বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমার কাঁধে যে যন্তরটা ঝুলছে তার অর্ধেক ফাংশানই আমি জানি না – লোকে ভাবছে আমি বুঝি বিনয় করছি। শুভ থাকলে বলতো – জালিগিরির শেষ নেই। কিন্তু আমি কি করবো! ওরা ভাবলে আমার কি দোষ!

এর পরের স্টপে বাস থেকে নামতেই একটা খুব পরিচিত গন্ধ পেলাম। মাঝে মাঝেই ইলেভেন-টুয়েলভের কেমিস্ট্রি ল্যাব থেকে এই গন্ধ বেরিয়ে আমাদের স্কুলবাড়ী ভরিয়ে দিত। তারপর তো নিজেও বানিয়েছি সালফারের এই বাষ্প। একটা বিস্তীর্ন চত্বরে কাদামাটি টগবগ করে ফুটছে। কাঠের সেতু দিয়ে সেই ফুটন্ত মাটি পেরিয়ে এক গুহার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে গলগল করে সালফারের ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বেশিক্ষন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। এই গুহার নাম ড্র্যাগনস মাউথ – সত্যিই যেন এক ড্রাগনের মুখ থেকে আগুন বেরোচ্ছে – আর সেই সাথে গুমগুম আওয়াজ।

এবার আমার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে পড়া জ্ঞান একটু কাজে লাগাই। ইয়েলোস্টোন আসলে এক আগ্নেয়গিরি। শুধু ভলক্যানো নয়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক একে বর্ণনা করেছে সুপার ভলক্যানো বলে। শেষ অগ্নুৎপাত হয়েছিল ছশো চল্লিশ হাজার বছর আগে। তখনই ইয়েলোস্টোন তার বর্তমান রূপ নেয় – যা আমি সারাদিন ধরে দেখলাম। ইয়েলোস্টোনের আগ্নেয়গিরি এখনো অ্যাকটিভ। সরের মত পাতলা মাটির নিচে পৃথিবী এখনো উত্তপ্ত এবং চঞ্চল। তারই প্রকাশ ঘটছে এখানে সেখানে। বাসে যেতে যেতে মাঝে মাঝেই দেখছি মাটি থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এমন দৃশ্য তো আগে দেখি নি কখনো। অদ্ভুত একটা অনুভুতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী বানানোর কারখানায় গাইডেড ট্যুর নিয়েছি।

ইয়েলোস্টোনের যে ইনফরমেশন ব্রোশিওরটা পার্কে ঢোকার সময় হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল তাতে দেখছি লেখা আছে – Yellowstone Lake is the largest mountain lake in North America. মাউন্টেন লেক কাকে বলে আমি জানি না। তবে লার্জেস্ট হোক বা না হোক, ইয়েলোস্টোনের মত লেক যে পৃথিবীতে খুব বেশি নেই সেটা নিশ্চয়ই সত্যি। এটাই আমার দেখা প্রথম লেক যেখানে জ্বালামুখী গহ্বর থেকে বাষ্প বেরিয়ে বুদ বুদ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে জলের মাঝে। লেকের পাশে এই জায়গাটার নাম ওয়েস্ট থাম্ব। এখানে যে কতগুলো মাড পুল, হট স্প্রিং, গীজার আছে আমি গুনে রাখতে পারি নি। গাইড সময় দিয়েছিল পঁয়তাল্লিশ মিনিট। সবকটা পুলে একবার করে উঁকি মেরে যখন বাসে ফিরলাম তখন সবাই হাততালি দিয়ে আমাকে ওয়েলকাম ব্যাক করলো – অধমের সময়ের হিসেব ছিল না – এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছিল। নীলকান্ত মনির মত টলটলে নীলকে ঘিরে সালফারের হলুদ – তাকে জড়িয়ে আছে সাদা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। কাছে গেলে গরম বাতাসের হলকা লাগছে গায়ে। লাগারই কথা। পুলের ভেতরের ঐ তরলের উষ্ণতা যে প্রায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইট!

এরপর লাঞ্চব্রেক ওল্ড ফেইথফুল ইন এ। ওল্ড ফেইথফুল পৃথিবীর সব চেয়ে বিখ্যাত গীজারগুলোর মধ্যে একটি। আর ইয়েলোস্টোনের সব চেয়ে পুরোনো ব্যাবসায়িক সাফল্য। প্রতি ঘন্টা দেড়েক অন্তর পৃথিবী এখানে প্রায় চার হাজার গ্যালন ফুটন্ত জল উদগীরন করে তার বুকের ভেতর থেকে। এমন রেগুলার ইন্টারভ্যালে পারফর্ম্যান্সের জন্যই নাম হয়েছে ওল্ড ফেইথফুল। কালীপুজোর রাতের ইলেকট্রিক তুবড়ির মত এই বিস্ফোরন। আসলে তার চেয়ে অনেকটাই বেশি। কারন এই তুবড়ি লাফিয়ে ওঠে প্রায় দেড়শো ফুট। বাজি ফোটানো দেখার পরও হাতে কিছুটা সময় ছিল। একটা কফি হাতে বসেছি লজের বারান্দায়। এক টুসটুসে বুড়ি আমার সাথে ভাব জমালো। ষাটের দশকে সে প্রথম ইয়েলোস্টোন আসে। ক্যানিয়নে গিয়ে পিকনিকের স্মৃতি তার এখনো অমলিন। এখন আর হাঁটতে পারে না। নাতি-নাতনীরা পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বুড়ি রয়েছে বসে। সামনে ওল্ড ফেইথফুল।

ইয়েলোস্টোনের যে ছবিটা আমাকে সব চেয়ে আকৃষ্ট করতো সেটা হল একটা গাঢ় নীল গহ্বর – এক কমলা আস্তরন তাকে সূর্যের ছটার মত ঘিরে রেখেছে। জেনেছিলাম তার নাম গ্র্যান্ড প্রিসম্যাটিক স্প্রিং। মিডওয়ে গীজার বেসিনে দেখা পাওয়া যাবে তার। তাই যখন গাইড বলল এর পরের গন্তব্য মিডওয়ে গীজার, তখন উত্তেজনায় বুক ধুকপুক – তারে আমি চোখে দেখি নি, তার অনেক গল্প শুনেছি – আর গল্প শুনে তাকে অল্প অল্প নয়, ভীষন ভীষন ভাবে দেখতে চেয়েছি। অবশেষে এল তাহলে সেই মুহুর্ত। ঠিক যেমনটা ছবিতে দেখেছিলাম তেমনটা দেখা গেল না। কারন গ্র্যান্ড প্রিসম্যাটিকের ব্যাস ৩৭০ ফুট। ছবিটা আকাশ থেকে নেওয়া। তাই ওই নীল তারার মত বিচ্ছুরন দেখা যায়। আমি দেখলাম মাটি থেকে। তবে যা দেখলাম তাতেও জন্ম সার্থক। চেনা পৃথিবীর কোন চিহ্ন সেখানে নেই। ফুটন্ত ফুটিফাটা মাটি। তার মাঝে ঐ গাঢ় অপার্থিব নীল – অত বিশাল বলেই বোধহয় প্রশান্ত গম্ভীর। তার মাঝখান থেকে ধোঁয়া উঠছে – মুখে এসে ঝাপটা দিচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে উঠে আসা সেই উষ্ণতা। আর সেই নীলকান্ত মনিকে ঘিরে আছে কমলা চাদর। ঐ কমলা চাদর আসলে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়ার বাসস্থান। চোখের সামনে সামনে জীবনের এই রূপ দেখে আমি নড়তে পারছিলাম না। গাইড এসে বলল এবারেও দেরি করলে বাসে উঠে গান গাইতে হবে। অগত্যা ফিরতেই হল।

মিডওয়ে গীজার দেখার পর আমার আর কিছু চাইবার ছিল না। গাইড নিয়ে গেল লোয়ার গীজার বেসিনে। আবার ব্যাকটেরিয়ার চাদর। আবার সেই আদিম প্রাণের স্পন্দন। দেখি এর মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে এক মরা গাছের গুঁড়ি। ১৯৮৪তে এক বিশাল দাবানলে ইয়েলোস্টোনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পুড়ে গেছিল। ঐ মরা গাছ সেই অগ্নিকান্ডেরই শিকার।

বেলা বয়ে যায়। আমাদের বাস এল ম্যামথ হটস্প্রিং এ। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। হাজার হাজার বছর ধরে ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমে মাটি এখানে মৃত্যুর মত সাদা। কিছু প্রানহীন গাছ দাঁড়িয়ে আছে ইতি-উতি। যে কোন মুহুর্তে কালো হুড পরা একটি লোক বেরিয়ে এসে বলতেই পারে – চেক মেট। আর কি আশ্চর্য – তারই মধ্যে তৈরী হচ্ছে জীবন। সাদা পাথরের ভাঁজে ভাঁজে যে বাদামী রেখা – সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইডের ভরসায় সংসার পেতেছে ব্যাকটেরিয়ার দল।

দিনের শেষ গন্তব্য রুজভেল্ট টাওয়ার। ইয়েলোস্টোনের সব চেয়ে উঁচু জায়গা। এখানে এসে আবার দেখা হল ইয়েলোস্টোন নদীর সাথে। পাহাড় কেটে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে। রকির শরীরে কোটি কোটি বছরের ভাঙ্গাগড়ার ছাপ। পাইনের বন দাঁড়িয়ে আছে কে জানে কত প্রজন্ম ধরে। আজ এই নশ্বর মানুষ – কালের সমুদ্রে একটি বুদবুদের মত যার অস্তিত্ব – সে আজ এখানে এসে দাঁড়ালো।

অনেকক্ষন লেখার পর খেয়াল হল প্রায় সোয়া পাঁচটা বাজে। জানলার পর্দা সরিয়ে দিলাম। এখনো আলো ফোটে নি। এই আদিম পৃথিবীতে অন্ধকারে চোখ মেলে চেয়ে আছি আমি একা। বাইরে পাইনের সারি জ্যোৎস্নায় ভিজে চুপ। বিষাদক্লিষ্ট সুঁড়ি পথ চলে গেছে কোন গভীরে। এখনি একটা সাদা ঘোড়া এসে দাঁড়াবে। ম্যাজিক আর রিয়েলিটির শেষ সীমানাটাও মুছে যাবে।

আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো
খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধ রাতে ডানার সঞ্চার
পুরানো প্যাঁচার ঘ্রান – অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ – মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে ডালে ডাকিয়াছে বক
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক।
১৩ই অগাস্ট, ২০০৯ – ভোর ৫:০০ – সল্টলেক সিটি এয়ারপোর্ট

যাত্রা হল শেষ। এবার বাড়ির পথে। গত দুদিনের ডায়েরীতে শুধু গন্তব্যের বিবরনই দিয়েছি। যে মানুষগুলোর সাথে সেই গন্তব্যে পাড়ী তাদের কথা বলাই হয় নি। গাইড-দা কে দিয়েই শুরু করা যাক। গাইডটা ঠিক দুটি ইংরিজি জানে – “ইউ নো” আর “কাইন্ড অফ লাইক”। মাত্র দুটি শব্দবন্ধ ব্যবহারে যাবতীয় মনের ভাব প্রকাশ করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। তবে ভদ্রলোকের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। কিপ গোয়িং গাইড-দা!

গাইড-দার চৈনিক ইংরিজি বোধগম্য ভাষায় অনুবাদ করে এই কদিন যে আমার পরিত্রাতার ভুমিকা পালন করেছে সে হল চাইনীজ মেয়ে শেরি। শেরির বাবা মেডিকেল সায়েন্সে রিসার্চ করে। ছমাসের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হসপিটালে এসেছে। শেরি তার মায়ের সাথে সামার ভ্যাকেশনের ছুটিতে বেড়াতে এসেছে বাবার কাছে। শেরির বাবা ভাঙা ইংরিজি বলতে পারে। তবে শেরির মা – যাকে আমি মনে মনে হাসি-বৌদি বলে ডাকছিলাম – একদমই ইংরিজি জানে না – শুধু মিষ্টি করে হাসে। আর ভারী সুন্দর দেখতে – ওর হাসিটা মনে থেকে যাবে অনেকদিন। চিনে এখন ইংরিজি শেখার দিকে ভালোমত জোর দেওয়া হচ্ছে বলেই বোধহয় এদের মধ্যে সবচেয়ে বলিয়ে কইয়ে হল শেরি। আমি ওকে একটা চকোলেট দিতেই ও খুব খুশি হয়ে জানিয়ে দিল – তুমি আমায় টিয়ান-টিয়ান নামে ডাকতে পারো – আমি খুব মিষ্টি ভালোবাসি বলে আমার চাইনিজ নাম টিয়ান-টিয়ান। চাইনিজে টিয়ান-টিয়ান মানে সুইট। দুই মিষ্টান্ন প্রেমিকের আলাপ জমতে কখনোই দেরি হয় না। এক্ষেত্রেও হল না। টিয়ান-টিয়ান শুধু মিষ্টি মেয়েই নয়, ও খুব ভালো গান গায়। হাঙ্গেরীতে গিয়ে চিনকে রিপ্রেজেন্ট করে এসেছে গত বছর।

এছাড়াও আছে কাম্বোডিয়ান কাকু-কাকিমা। কাম্বো-কাকুর একমাত্র কাজ যে কোন সুদৃশ্য অথবা কুদৃশ্য জায়গায় কাকিমাকে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা। এমন কি দেখি ট্র্যাশক্যানের সামনে দাঁড়িয়েও ছবি তুলছে। তবে কাম্বো-কাকু আমার ছবিও তুলে দিয়েছে। এই ট্রিপে আমার যে কটি ছবি উঠেছে বেশির ভাগই কাম্বো-কাকু অথবা চিনে-দা (শেরির বাবা) তুলে দিয়েছে।

ফিলিপিনো জ্যেঠু-জ্যেঠিমাদের কথাও বলতে হয়। তিন জোড়া বুড়ো-বুড়ি দল বেঁধে বেড়াতে এসেছে। খুব আমুদে মানুষ। সব সময় হৈ চৈ করছে। তবে বড্ড কৌতুহলী। তুমি একা এসেছ কেন, তোমার কি কোন বয়ফ্রেন্ড বা হাজব্যান্ড নেই, তুমি একটা ব্যাগপ্যাকে পাঁচ দিনের লাগেজ কি করে ঢোকালে, তুমি ইন্ডিয়ান হয়েও স্টেক খাচ্ছো কেন। রে দুর্বিনিত, আর প্রশ্ন করিয়ো না, এবার মুন্ড খসিয়া পড়িবে! তাও মোটের ওপর মানুষগুলো ভালোই। পাড়ার গায়ে পড়া অথচ স্নেহশীল বড়রা যেমন হয় আর কি! এক জ্যেঠিমাকে তো এক খানা সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দিলেই বারোয়ারী পুজোর কাজে লাগিয়ে দেওয়া যায়। সে খুব খেয়াল রেখেছিল আমার। শুচি তুমি একা থাকবে, ভয় পাবে না তো? সকালে উঠতে পারবে তো? নাকি আমি ডেকে দেব তোমায়? এমন মিষ্টি জ্যেঠিমার নাকটা লম্বা হলেও তাকে ক্ষমা করে দিতেই হয় শেষ পর্যন্ত।

আমার ফোটোগ্রাফি এক্সপার্টিসের মিথটা যে প্রথম চালু করল সেই চাইনীজ মেয়েটির কথাই বা ভুলি কি করে। তার নামটা জানা হয় নি। তবে সে সর্বক্ষন তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে বেড়াত বলে তাকে ফড়িং নামে ডাকাই যায়। ফড়িং-এর মা আমাকে দেখতে পেলেই চাইনীজে প্রচুর বকবক করে। ফড়িং এসে তার মা-কে সামলায়। ওদের থেকে আমি একটা চাইনীজ শব্দ শিখেছি। শে-শে। মানে ধন্যবাদ।

আর কথা বলতো বটে ডোনা। ডোনা যদিও তিরিশ বছর এদেশে আছে, কিন্তু ইংরিজিটা এখনো ভালো রপ্ত হয় নি। কিন্তু কথা বলতে তার ভীষন উৎসাহ। আর আমার সামনে সে কঠিন ইংরিজিতে ইয়েলোস্টোনের সৌন্দর্য বর্ণনা করবেই করবে।

কাল দুপুরে ইয়েলোস্টোন থেকে ফেরার পথে আমরা লাঞ্চ করতে গেলাম এক চিনে বাফেতে। গাইডদা বলল ওরা একটা স্যুপ বানায় ভাল্লুকের মাংসের স্টক দিয়ে। আমার তো শুনেই মনে পড়ে গেল টুম্পার কথা। টুম্পা আমার মায়ের মাসতুতো বোন, কিন্তু আমার থেকে বয়সে ছোটো। ও ছোটোবেলা থেকেই খুব ইউনিক। মুর্গি-পাঁঠা জাতীয় নিরীহ মাংসে ওর মন উঠতো না। বাঘ-সিংহ হলেই ভালো হয়। তবে একান্ত না পেলে ভাল্লুক বা গণ্ডারও চলতে পারে – এরকম একটা দাবী ছিল ওর। আমি ছোটোবেলায় এতো দুঃসাহসী ছিলাম না। তবে এখন একবার টুম্পা হওয়ার চেষ্টা করা যেতেই পারে এই ভেবে আমি এক বাটি স্যুপ নিয়ে বসলাম। বেশ ভালোই খেতে। তবে ঝোলটা ভাল্লুকের নাকি বাইসনের নাকি পাতি মুর্গির সেটা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। হাসি বৌদির বোধহয় খুব ভালো লেগেছিল। স্যুপই খেয়ে নিল চার বাটি।

খাওয়ার শেষে আবার বাস যাত্রা। গাইড-দা একটা হিস্টোরিক চাইনীজ সিনেমা চালিয়ে দিয়েছে। আমি সাব-টাইটেলের সাহায্যে সেটা দেখছি। হিরো সবে হিরোইনকে চুমু-টুমু খেয়ে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে - বাস ঢুকে পড়লো সল্টলেক সিটিতে।

সল্টলেক সিটিতে একটা মর্মন চার্চ আছে। শেষ দিনের ট্যুরে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার কথা। জনৈক বার্মিংহ্যাম ইয়ং হাজার মাইল পরিভ্রমন এই জায়গাটিকেই চার্চ বানাবার উপযুক্ত মনে করেন এবং পঁচিশ মাইল দুরের একটি ক্যানিয়ন থেকে পাথর নিয়ে এসে এই চার্চ তৈরী হয়। ধর্মস্থান নিয়ে আমার কোন ছুঁতমার্গ নেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আর্কিটেকচারগুলোর অধিকাংশই তো ধর্মস্থান। কিন্তু এই চার্চটি মোটেই সুদৃশ্য নয়। ডাউনটাউনের মধ্যে ছোট্ট একটা জায়গায় গথিক স্টাইলের বাড়ি – আমার তো একেবারেই ভালো লাগলো না। তবে লিখে রাখলাম কারন এইখানে এসে আমাদের ট্যুর শেষ হল। পাঁচদিনের পর সবাই এবার যে যার মত এয়ারপোর্টে বা হোটেলে।

আবার কাল থেকে অফিস। আবার স্যাস, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট। মাঝে কিছুদিনের জন্য রকির সান্নিধ্য ভুলিয়ে দিয়েছিল এসব। কাম্বো-কাকু, ফিলি-জ্যেঠি, চিনে-দা, হাসি বৌদি, টিয়ান-টিয়ান – এরা সবাই মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। ভেবেছিলাম টিয়ান-টিয়ানের সাথে একটা ছবি তুলবো। হোটেলে চলে আসার পর খেয়াল হল সেকথা। যাক গে! ও যখন বড় হবে কোন দিন হয়তো দেখতে পাবো ওকে টিভির পর্দায় গান গাইতে। হয়তো তখন ওকে চিনতেও পারবো না। তাহলে কি সেই অমোঘ ফেলে আসার গান দিয়ে শেষ করি?

My heart is down
My head is turning around
I had to leave my little girl in Kingston Town!

ক্লিশে? তা হোক। কবি বলে গেছেন সত্যি কথা জমলে অমনই হয়।

Saturday, August 1, 2009

সেই নীল কেডসের গল্প

একটা ইরানীয়ান সিনেমা দেখছিলাম – Children of Heaven। দুই ভাই-বোন। খুব গরীব তারা। বোনের জুতোটি চুরি যায়। কিন্তু মাসের মাঝখানে নতুন জুতো আসবে কি কোথা থেকে। তাই তারা বাবা-মার থেকে জুতোচুরির কথা গোপন করে। ভাইয়ের জুতো পরে মেয়েটি সকালবেলা তার স্কুলে যায়। ছুটি হওয়া মাত্র সে দৌড়তে থাকে বাড়ির দিকে – যেখানে তার ভাই স্কুলব্যাগ কাঁধে অপেক্ষা করে আছে। বোন এসে পৌঁছানো মাত্র তার পা থেকে জুতো খুলে সে রওনা দেবে তার স্কুলের পথে।

কেন জানিনা ছোটোবেলায় আমার ধারনা ছিল আমরা খুব গরীব। বড়লোক না হলেও জুতো কিনে দেওয়ার মত পয়সা আমার বাবা-মার ছিল। কিন্তু আমি তা জানতাম না। তখন আমি ফোরে পড়ি। আমার একটা গাঢ় নীল রঙের কেডস জুতো ছিল। আমার বন্ধুরা যদিও মাঝে মধ্যেই নিউকাট বা ব্যালেরিনা পরে ফেলতো, আমার স্বপ্নের দৌড় ছিল ঐ নীল কেডস ছাড়িয়ে বড়জোর একটা পালিশ করা কালো রঙের পাম্প। তবে স্বপ্ন ছিল মনেই। প্রকাশ করার সাহস হয়নি কখনো।

তারপর তো সেই মেয়ে ফাইভে উঠলো। অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে ভর্তি হল নতুন স্কুলে। বিশাল বড় বাড়ি। বিশাল খেলার মাঠ। মাঠ ভর্তি সাদা জামা নীল ফিতে বাঁধা মেয়ের দল। আর রাশভারী দিদিমনিরা। প্রথম দিন স্কুলে গেলাম। সাদা জামা। মাথায় ক্লিপ দিয়ে গোঁজা নীল ফিতের ফুল। পায়ে কিন্তু সেই নীল কেডস। সাদা কেডস পরা মেয়েদের এর আগে আমি দেখেছিলাম। আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়েই স্কুলের পথে হেঁটে যেতে। কিন্তু আমার বাবা বললেন জুতো পরা নিয়ে তো কথা। সাদা যদি চলে তো নীলও চলবে। অগত্যা আমি ঐ নীল জুতো পরেই দাঁড়ালাম প্রার্থনার লাইনে।

প্রেয়ারের পরেই খেলার টিচার খুশীদি ক্লাস ফাইভের নতুন আমদানীদের সার দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন মাঠের মাঝে। তীক্ষ চোখ জরীপ করতে লাগলো সদ্য আসা মেষ-শাবকদের। কার মাথায় ফিতে নেই, কার তখনো ব্যাজ কেনা হয় নি, কার নখের কোনে ময়লা, কোন মেয়ে কেডসের ওপরেই নূপুর পরে চলে এসেছে – সব অমার্জনীয় অপরাধীদের আলাদা লাইনে দাঁড় করাতে করাতে খুশীদির চোখ পড়লো আমার পায়ে। সারি সারি সাদা জুতোর আড়ালে আমার অপরাধী পা-কে আড়াল করার যথাসাধ্য চেষ্টা যদিও আমি করেছিলাম – কিন্তু ধরা সেই পড়েই গেলাম। হুকুম হল পরের দিন থেকে সাদা কেডস পরে আসার।

হুকুম তো হল। কিন্তু সাদা জুতো আমি পাবো কোথায়! একটা নতুন জুতোর কত দাম হতে পারে তার কোন ধারনা আমার ছিল না। বাড়িতে বলি কি করে। যদি বাবা-মা না দিতে পারে। যদি তাদের কষ্ট হয়। তাই পরের দিনও ঐ নীল জুতো পরেই আমি স্কুলে গেলাম। তখনো আমার ভগবানে খুব বিশ্বাস। প্রানপনে ঠাকুর ডাকছি। আজ যেন খুশীদি না আসেন। যেন ধরা না পড়ি। হে ঠাকুর পা-টা কেন মাটির মধ্যে ঢুকে যায় না আমার! কিন্তু ঠাকুর সেদিন বধির হলেন। আবার দাঁড়াতে হল আলাদা লাইনে। প্রার্থনার লাইনে দাঁড়ানো সব মেয়ে ক্লাসে ঢুকে গেল। আমি রইলাম পড়ে আরও জনা-পাঁচেকের সাথে মাঠের মাঝে। সেদিনও কেন পায়ে নীল জুতো তার কোন উত্তরই আমার কাছে ছিল না।

এবং তার পরের দিনও। আবার দাঁড়িয়ে থাকা বোবা হয়ে রোদের মাঝে। এবার বোধহয় খুশীদির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। উনি বললেন কালও যদি তোমায় নীল কেডসে দেখি তা হলে বাবার থেকে চিঠি নিয়ে আসবে। আমার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। জুতোর কথা তাহলে আর আড়াল করা যাবে না বাবা-মার থেকে। জানাতেই হবে ওদের। কিন্তু কি ভাবে কিনবে তারা জুতো মাসের মাঝখানে! খুশীদিকে পৃথিবীর সব থেকে খারাপ মানুষ মনে হতে লাগলো। আর এক রাশ চিন্তার পাহাড় বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম সেদিন স্কুল থেকে।

খুব ভয়ে ভয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বললাম জুতোর কথা। মা বললেন একথা আগে বলো নি কেন। সেদিনই চলে এল আমার সাদা কেডস। বাবার চিঠি ছাড়াই স্কুলে গেলাম পরের দিন। দাঁড়াতে হল না আলাদা লাইনেও। আমার গল্পটা কোন সিনেমার গল্প নয়। কোন জীবন সংগ্রামের গল্প নয়। তবে ইরানের একটি গ্রামে বড় হতে থাকা দুই ভাই-বোনের ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ অনেক দিন আগের একটা বাচ্চা মেয়ের বোকামির কথা মনে পড়ে গেল। তাই লিখে রাখা।

Monday, December 31, 2007

মিশরের গল্প

 ১৫ নভেম্বর, ২০০৭, সকাল ৯:৩৭


আজ আমরা মিশর যাচ্ছি৷ এটুকু লিখেই একটা অদ্ভুত অনুভুতি হল৷ যেন এখনো বিশ্বাসই করতে পারছি না৷ মনে হচ্ছে একটা স্বপ্ন দেখছি, এখনি ভেঙে যাবে৷ মিশরের সাথে প্রথম কবে পরিচয়! ..... অনেক ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে৷ কোন এক আনন্দমেলা পুজোসংখ্যায় বেরিয়েছিল শৈলেন ঘোষের গল্প৷ এক ফারাও আর তার ছোট্টো মেয়েকে নিয়ে৷ সেই প্রথম ভালো লাগা৷ সুর্যদেবতা রা, মৃত্যুদেবতা আনুবিসের সাথে মিশরের রহস্যমাখা ইতিহাসে প্রথম প্রবেশ৷ বোধহয় জীবনের প্রথম রোম্যান্স!!

কিছু দিন পর বাবা স্কুল থেকে ফেরার সময় নিয়ে এসেছিল একটা আনন্দমেলা৷ এখনো মনে আছে .... দুপুরে টিভিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর একটা সিনেমা হচ্ছিল৷ আমাদের টিভিবর্জিত ছোটোবেলায় শুধুমাত্র এই জাতীয় কিছু অনুষ্ঠান হলেই বিনোদনের নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশের অনুমতি মিলতো৷ কিন্তু সেই নিষিদ্ধ জগতের আকর্ষনও সেদিন তুচ্ছ হয়ে গেছিল ঐ আনন্দমেলাটা পেয়ে৷ পত্রিকার প্রচ্ছদে কিশোর রাজা তুতানখামুনের মুখ আমার সম্মোহিত করে ফেলেছিল৷ সোনার মুখোসের নিচে তিনহাজার বছর ধরে শুয়ে আছে মিশরীয় কিশোর৷ তার সমাধিমন্দিরের দেওয়ালে আশ্চর্য উজ্জ্বল রঙে আশ্চর্য সব কাহিনী লেখা৷ নীলনদের জলে বয়ে যাওয়া কত ইতিহাস৷ কত নারীর দীর্ঘশ্বাস৷ তাদের স্বামী-পুত্রের রক্তজল করা কীর্তি আজও পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে৷ মিশর আমায় বিস্ময়াবিষ্ট করে রেখেছে সেই ছোটোবেলার দিনগুলি থেকে আজ পর্যন্ত৷ মিশর যেন বাস্তব হয়েও অবাস্তব, অপার্থিব এক দেশ৷ স্বপ্নে দেখা, গল্পে শোনা যে রূপকথা - সেই রূপকথার দেশ মিশর৷

আজ থেকে পাঁচবছর আগেও কল্পনা করিনি এই রূপকথার মাটিতে আমার পা পড়বে৷ কিন্তু গত কয়েকবছরে পৃথিবী এমন ছোটো হয়ে এসেছে - এখন বুঝি রূপকথাকেও ছোঁয়া সম্ভব৷ আমিও ছুঁতে চলেছি আর কিছুক্ষনের মধ্যেই৷ এখন আমরা প্লেনে৷ নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি৷ জন এফ কেনেডী এয়ারপোর্ট থেকে বিকেলে ছাড়বে কায়রোর ফ্লাইট৷ বেশি না৷ আর মাত্রই চব্বিশ ঘন্টার ব্যবধান৷ তারপর? নাহ .... এখনো ভাবতে পারছি না :) এই ফাঁকে আমরা কোথায় কোথায় যাবো তার একটা হিসেব দিয়ে নিই৷

১৬ নভেম্বর - কায়রো পৌঁছাবো দুপুর নাগাদ৷ যদি খুব টায়ার্ড না থাকি তাহলে খাল-এল-খালিল নামে কায়রোর বিখ্যাত বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা আছে৷ প্রাচীন এই বাজার মশলার জন্য বিখ্যাত৷ শুভর ইচ্ছা আছে এই বাজারে বসে হুঁকো টানার :) দেখা যাক এই প্ল্যান কতদুর সফল হয়৷

১৭ নভেম্বর - ভোর বেলায় লাক্সরের প্লেন ধরতে হবে৷ লাক্সর থেকে ছাড়ছে আমাদের নাইল ক্রুজ৷ নীলনদের ওপর তিনদিন ঘুরে বেরাবো প্রমোদতরনীতে :) মাঝে মাঝে তরী ভিড়বে তীরে৷ মিশরের প্রাচীন ইতিহাসের দরজাগুলো খুলে যাবে একে একে৷ লাল মাটির পথ বেয়ে আমরা পৌঁছে যাবো সেই সময়ে যখন শুরু হয়েছিলো পৃথিবীর প্রথম আধুনিক সভ্যতা৷
১৭ তারিখ আমরা ঘুরছি ভ্যালি অফ কিংস, ভ্যালি অফ কুইন্সে৷ এই সমাধিগুলো আনুমানিক দেড়হাজার খ্রীষ্টপুর্বাদের৷ পিরামিডের পরের যুগের ফারওরা এখানে সমাধিস্থ হয়েছে৷ শুধু ফারাও নয়, তাদের আত্মীয়রাও৷ এমনকি অনেক সময় রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কিত অভিজাতরাও৷এদিন আরো দেখছি রানী হশেপসুতের মন্দির৷ ক্লিওপেট্রাকে বাদ দিলে এই রানীই মিশরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মহিলা ফারাও৷ আনুমনিক দেড়হাজার খ্রীষ্টপুর্বাব্দ নাগাদ ইনি বাইশ বছর রাজত্ব করেন৷ এর মৃত্যুর পর এর সব চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছিল রাজপরিবারের ইতিহাস থেকে৷ মেয়ে হয়ে পুরুষের কাজ করার শাস্তি!!
১৭ তারিখ আরো দেখছি কলোসি অফ মেনন৷ নীলনদের তীরে আমেনহোতেপের এই বিশাল মুর্তি থেকে একসময় অদ্ভুত সব আওয়াজ বেরোতো৷ লোকে ভাবতো দেবতা অসন্তুষ্ট হয়েছেন৷ তারপর একবার মুর্তিটি মেরমত করতে গিয়ে এই আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায় :)

১৮ নভেম্বর - এদিন যাবো কার্নাক টেম্পলে৷ প্রাচীন পৃথিবীর সব চেয়ে বড়ো ধর্মস্থান যা আজও টিকে আছে৷

১৯ নভেম্বর - অশ্বচালিত শকটে চেপে এই দিন যাচ্ছি দুই হাজার বছরের পুরোনো হোরাসের মন্দিরে৷ আইসিস আর ওসিরিসের ছেলে হোরাস - খুব ইন্টারেস্টিং গল্প আছে এই হোরাসের জন্ম নিয়ে৷ ভুমিদেব গেব আর আকাশদেবী নুতের দুই ছেলে - ওসিরিস আর সেথ৷ ওসিরিস দক্ষিন মিশরের রাজা - জমি যেখানে রুক্ষ, পাথুরে, বছরে এক দিন বৃষ্টি হয় কি হয় না৷ আর তার ভাই সেথ রাজত্ব করেন উত্তর মিশরে নীলনদের শস্যশ্যামলা মোহানায়৷ এদের আরো দুই বোন আছে - আইসিস আর নেফতিস৷ মিশরের রীতি অনুযায়ী ভাই-বোনের সম্পর্ক অতি পবিত্র বিবাহ সম্পর্ক৷ গেব আর নুতও সহোদর ভাই বোন৷ তো সেই মত সেথের সাথে নেফতিসের আর ওসিরিসের সাথে আইসিসের বিয়ে হয়৷ ওসিরিস খুব জনপ্রিয় রাজা৷ সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ সেথের সেটা সহ্য হয়না৷ সে হিংসায় জ্বলতে থাকে৷ সেথের বৌ নেফতিসও লোকপ্রিয় ওসিরিসের অনুরক্ত৷ সেথ তাই ওসিরিসকে হত্যা করে৷ শুধু মেরে ফেলেই শন্ত হয়না৷ ওসিরিসের দেহ চোদ্দোটি টুকরো করে ছড়িয়ে দেয় মিশরের পথেঘাটে৷ আইসিস ওসিরিসকে খুঁজে বেড়ায়৷ ওসিরিসের দেহের টুকরোগুলো একে একে উদ্ধার হতে থাকে৷ প্রানহীন টুকরোগুলোকে নিয়ে কাপড়ে জড়িয়ে সুগন্ধি মাখিয়ে মমি তৈরী করে৷ কিন্তু এভাবেই কি শেষ হয়ে যাবে মিশরের প্রাণের মানুষ ওসিরিস - এমনকি কোন উত্তরাধিকারী না রেখেই!! জ্ঞানের দেবতা থথ তখন আইসিসকে জাদুবিদ্যা শেখান৷ একদিনের জন্য মৃত ওসিরিসের দেহে প্রাণসৃষ্টি হয়৷ হোরাসের জন্মের বীজ বপন করে এবার চিরকালের জন্য মৃত্যুর জগতে পা বাড়ান ওসিরিস৷ তখন থেকে মিশরের রাজা ওসিরিস হলেন মৃত্যুর দেশের রাজা৷ আর আইসিস রইলেন পৃথিবীতেই৷ মমতা ও রোগমুক্তির দেবী হয়ে৷

২০ নভেম্বর - এইদিন যাচ্ছি অসোয়ানের বিখ্যাত বাঁধ দেখতে৷ এটা অবশ্য প্রাচীন পৃথিবীর নিদর্শন নয় ষাটের দশকে তৈরী৷ তারপর যাবো রানী হশেপসুতের আমলে তৈরী হওয়া অসমাপ্ত ওবেলিস্ক দেখতে৷ তৈরী শুরু হওয়ার কিছুদিন পর এটা কোন কারনে পরিত্যক্ত হয়৷ সাড়ে তিন হাজার বছর আগের মানুষেরা কি ভাবে পাথর কেটে কেটে এই বিশাল তোরনগুলো বানিয়েছিল তার কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায় এই অসমাপ্ত ওবেলিস্কটা দেখলে৷ তারপর যাবো ফিলিতে আইসিসের মন্দির দেখতে৷ আইসিসের গল্প তো আগেই বলেছি৷ আইসিসের পুজা একসময় মিশরে এতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে আইসিসের নাম মিশর ছড়িয়ে পৌঁছে যায় গ্রীস-রোমে৷ গ্রীক দেবী আফ্রোদাইত আর আইসিসের মধ্যে মিল খুঁজে পান কেউ কেউ৷

২১ নভেম্বর - পিরামিড, স্ফিংক্স আর ইজিপ্সিয়ান মিউসিয়াম দেখবো৷ তুতানখামুনের সোনার মুখোশ - আনন্দমেলায় প্রচ্ছদে যার ছবি দেখে প্রথম পাগল হয়েছিলাম - সেই মুখোশ দেখবো নিজের চোখে - স্বপ্ন নয়, সত্যিকারের মুখোশ!!

২২ তারিখ ঘরে ফেরা৷


১৫ নভেম্বর, বিকেল ৩:৪৬, জে এফ কে এয়ারপোর্ট

এখন এয়ারপোর্টে৷ সিকিউরিটি চেক-ইন হয়ে গেছে৷ বসে আছি প্লেনের অপেক্ষায়৷ দুপুরে জ্যাকসন হাইটসে বেশ ভালই পেটপুজো হল৷ একটা পাকিস্তানী দোকানে দুর্দান্ত শামি কাবাব আর নিহারী খেলম৷ আমার পেটুক বর প্রথমেই আমার অলক্ষ্যে চারখানা নানের অর্ডার দিয়ে বসলো৷ অতিকষ্টে তিনখানা খাওয়া গেল৷ হাল্কা জিরের গন্ধওয়ালা সুস্বাদু গরুর মাংসের ঝোল নিজামের বিফকারীর দিনগুলোকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছিলো৷ সব শেষে গাজরের হালুয়া দিয়ে মিষ্টি মুখ৷ এতো ভালো গাজরের হালুয়া আমরা কোত্থাও খাই নি৷ আর কিছু না হোক এই গাজরের হালুয়ার জন্যই আজ নিউ ইয়র্ক আসা সার্থক :) আমাদের রেস্টোরান্টের পাশে দেখলাম দিব্যি সালোয়ার কামিজ আর শাড়ী বিক্রি হচ্ছে৷ জল থৈ থৈ জ্যাকসন হাইটস, সরু রাস্তা, রাস্তার ধারে শামী কাবাব আর শাড়ীর দোকান পাশাপাশি - সব মিলিয়ে একদম গড়িয়াহাট৷ আপাতত গড়িয়াহাটের মায়া ছেড়ে জে এফ কের ছত্রছায়ায়৷ আর কিছুক্ষনের মধ্যেই উড়ে যাবো মিশরের পথে!!

১৬ নভেম্বর, বিকেল ৪:৩০, কায়রো

আজ দুপুর দুটো নাগাদ এসে পৌঁছেছি৷ প্লেন থেকে দেখলম রুক্ষ মাটি, ধুষর বালিতে ঢাকা - তার মাঝে মাঝে উঁচু উঁচু বহুতল - উঁকি মারছে কায়রো শহর৷ এয়ারপোর্টে গেটওয়ান ট্রাভেলসের লোক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো৷ কাস্টমস অফিসারটি আমাদের দেশের অফিসারদের মতই খেঁকুরে টাইপের৷ পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মেরে উদ্ধার করে দিলো - এই রকম একটা ভাব৷ এয়ারপোর্ট থেকে বাসে হোটেলে এলাম৷ লাউঞ্জে অনেকক্ষন অপেক্ষা করার পর চাবি হাতে এলো৷ টুরিজম এদেশের অন্যতম প্রধান বিজনেস৷ সেই অনুপাতে এখানকার মানুষ যতখানি হসপিটেবল হবে ভেবেছিলাম তা কিন্তু মনে হচ্ছে না৷ আমার ইউনিভার্সিটির ইজিপসিয়ান সহপাঠীও অবশ্য এই কথাই বলেছিল৷খাল-এল-খালিলের প্ল্যান ক্যানসেল৷ নতুন দেশে এসেই একা একা বাজারে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না৷ তার বদলে পিরামিডের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখতে যাচ্ছি৷ ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আর মাত্র দুঘন্টা পরেই আমি পিরামিড দেখবো৷ রূপকথা সামনে এসে দাঁড়াবে!!

১৮ নভেম্বর, সকাল ৮:৪৫, নীলনদ

গত দুদিনে যা যা দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করবো এমন ক্ষমতা আমার নেই৷ কথাটা খুব ক্লিশে শোনালেও সত্যি৷এতোদিন যা শুধু বইএর পাতায়, টিভির পর্দায় আর কল্পনার চালচিত্রে দেখে এসেছি তা নিজের চোখের সামনে দেখা, শুধু দেখাই নয় হাত দিয়ে ছোঁয়া - আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য লাগছে৷

১৬ তারিখের সন্ধ্যা দিয়ে শুরু করি৷ বাসে করে আমাদের ওল্ড কায়রো নিয়ে যাওয়া হল৷ অনেকক্ষনের রাস্তা৷ কায়রোর রাস্তায় সিগনালের কোন বালাই নেই৷ যে যার নিজের ইচ্ছামত গাড়ি চালাচ্ছে এবং অবশ্যম্ভাবী অ্যাক্সিডেন্টগুলো ও নিপুণ কুশলতায় বাঁচিয়ে চলেছে৷ সেদিন ছিলো শুক্রবার৷ কায়রো শহরে অজস্র মসজিদ৷ খুব সুন্দর আলো দিয়ে সাজানো৷ একটা মসজিদে বেশ ভীড় দেখলাম৷ আমাদের গাইড মিমো জানালো ওখানে বিয়ে হচ্ছে৷ আমাদের হোটেলেও সেদিন একটা বিয়ের রিসেপশন হচ্ছিলো৷

কায়রোর মেয়েদের পোষাক বেশ বৈপরিত্যে ভরা৷ বিয়েতে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে আপদমস্তক বোরখাধারিনীও আছে, আবার অফশোল্ডার সাহসিনীও আছে৷ তবে রাস্তায় কোন অফশোল্ডার চোখে পরলো না, এমনকি কোন ওয়েস্টার্ন আউটফিটও না৷ রাস্তায় সবাই বোরখা৷ মুখ খোলা অবশ্য৷ ছেলেরা বেশিরভাগই সাধারন শার্টপ্যান্ট৷ কিছু এখান্কার ট্র্যাডিশনাল পোষাক পরা৷ লম্বা ঢিলেঢালা আলখাল্লা টাইপের পোষক - নাম গালাবা৷ কায়রোর রাস্তা দেখতে দেখতে দেশের কথা মনে পড়ছিলো৷ ঐ রকমই ট্রাফিক আইন না মানা মানুষ, ঐ রকমই স্টেশনারী দোকান রাস্তার ওপর৷ কতোদিন পর টিনের শাটার দেখলাম :) পথে পড়লো মহম্মদ আলি মস্ক৷ আঠারো শতকের তৈরী এই মসজিদের অপুর্ব স্থাপত্য৷ রাতের আলোয় আরো মোহময়ী লাগছিলো৷ আমার ইচ্ছা ছিলো এটা দেখার৷ কিন্তু আমাদের আইটিনেরারীতে ছিলো না৷ রাস্তায় দেখতে পেয়ে খুব ভালো লাগলো৷ তবে ছবি নেওয়া গেল না - এই যা দু:খ৷

মিমো আমাদের নিয়ে এলো একটা ঘিঞ্জি বাজারের মধ্যে৷ পাশে কোন মসজিদ থেকে তখন জোরে আজান দিচ্ছে৷ গাড়ীর হর্ণ, অজস্র বাস, গিজগিজে ভীড় - মনে হচ্ছিল দিল্লীতে আছি৷ একটা বড় দেওয়ালের গায়ে লেখা "গিজা সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো"৷ দেওয়ালের গায়ে একটা ছোটো জানলা৷ সেখান থেকে টিকিট বিক্রি হচ্ছে৷ টিকিট কেটে দেওয়ালের ওপারে গিয়ে পুরো একমিনিট মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোলো না৷ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে খেওপস, খেফরু আর মিসেরিনাসের তিনটি পিরামিড আর তাদের সামনে উজ্জ্বল নীল আলোয় জ্বলজ্বল করছে স্ফিংক্স৷ আমার মনে হল জীবন সার্থক হয়ে গেছে৷ এই আঠাশ বছর পর্যন্ত আমায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাকে যে ধন্যবাদ দিলাম জানি না৷ মনে হল জীবনের এক মাইলস্টোন পেরিয়ে এলাম৷

সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শোতে স্ফিংক্সের মুখ দিয়ে মিশরের ইতিহাস বলানো হল৷ জানা গল্প, নেট ঘাঁটলেই আজকাল পড়া যায়৷ কিন্তু ঐ সময়ে পিরামিডের সামনে বসে ঐ শোনা গল্পগুলো ই আবার শুনতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো৷ সাড়ে চারহাজার বছরের পুরোনো এই পিরামিড৷ একসময় বাইরের পাথরগুলো এতো চকচকে ছিলো যে সুর্যের রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে সারা মিশর এর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতো৷ আমুন-রায়ের পুরোহিতেরা দেখেছে এই পিরামিড, রামেসিস, আমুনহোতেপ, রানী হাতশেপসুত, কিশোর রাজা তুতানখামুন, ব্যক্তিত্বময়ী ক্লেওপেট্রা, ইতিহাসের জনক হেরোডেটাস, দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার, শত শত গ্রীক, রোমান, মুসলিম, খ্রীষ্টান সৈনিক - আর আজ আমরাও দেখলাম এই অতুলনীয় সৃষ্টি৷ অতুলনীয় কারন এটা মানুষের হাতে গড়া৷ আজকের মানুষ নয়, সাড়ে চারহাজার বছর আগের মানুষ - এমন পুর্বপুরুষের কথা ভাবলে মনে গর্ব হয়, অনুপ্রেরনা জাগে৷ আর কিছুদিন পর আমরা কোন অতলে চলে যাবো৷ কিন্তু এই পিরামিড থাকবে৷ আমরা যে এখানে এসেছিলাম মনে রাখবে কি? আমরা এই ইতিহাসের একটা বিন্দু হয়ে বেঁচে থাকবো কি? এই বিশালত্বের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম অনুভব করতে পারছি মানুষের অমর হওয়ার ইচ্ছা কি প্রবল! মানুষ শুধু বাঁচতে চায় না৷ ছাপ ফেলে যেতে চায়৷ "আনন্দাত্ জায়তে বিশ্ব, আনন্দাত্ পল্যতে তথা, আনন্দাত্ লীয়তে বিশ্ব, আনন্দ পরিপুরত:"৷ মানুষ চলে যাওয়ার পরেও এই পৃথিবীতে তার আনন্দটুকু রেখে যায়৷ পৃথিবীর আকাশে-বাতাসে তার আনন্দকণা ভেসে থাকে৷ পরের প্রজন্মের মানুষ সেই আনন্দ আঁজলা ভরে তুলে নেয়৷ আজ যেমন আমরা আড়াইহাজার খ্রীষ্টপুর্বাব্দের বুদ্ধি-শ্রম আর সৃষ্টির আনন্দ আকণ্ঠ পান করলাম৷

এতক্ষন কেবিনে বসে লিখছিলাম৷ এবার ডেকে উঠে এলাম৷ ভীষন ভালো লাগছে নীলনদের ওপর ভেসে বেড়াতে৷ আমার এক পাশে রুক্ষ পাহাড়, অপর পাশে সবুজ৷ কিন্তু সে কথা পরে৷ আগে কালকের গল্প বলে নিই৷

কাল ভোর দুটোতে উঠতে হয়েছে৷ লুক্সরের ফ্লাইট ছিল ভোর পাঁচটায়৷ লুক্সরে নেমে লাগেজ কালেক্ট করেই সাইট সিইং নাইলের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে৷ নীলনদের পশ্চিম উপকুল রুক্ষ, ধুষর, পাথুরে৷ ফারওরা তাই এই তীরটাকে বেছে নিয়েছিল তাদের শান্তিতে ঘুমনোর জায়গা হিসেবে৷ এই সমাধিগুলো কিন্তু পিরামিড নয়৷ পিরামিডগুলো সবই চার সাড়েচারহাজার বছর আগে তৈরী৷ পিরামিডের প্রবেশপথ যদিও গোপন রাখা হত, কিন্তু তা সজ্জ্বেও চুরিডাকাতি সেই প্রাচীনকালেও কিছু কম হয়নি৷ পিরামিডের অতুলনীয় ধনসম্পদের লোভে সেই যুগেও বহু লোক পিরামিড ভেঙে ঢুকেছে৷ তাই পরবর্তীকালের ফারওরা লুক্সরের কাছে নীলনদের পশ্চিমকুলের পাথুরে জমিকে বেছে নিয়েছিল তাদের সমাধির জন্য৷ মাঠির নিচে সমাধিকক্ষ তৈরী করে তার মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হত যাতে কেউ খুঁজে না পায়৷ এই সমাধিস্থলই ভ্যালি অফ কিংস আর ভ্যালি অফ কুইনস৷ ভ্যালি অফ কিংসে মুলত ফারওদের সমাধি দেওয়া হত৷ ভ্যালি অফ কুইনসে রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের৷

আমরা প্রথমে গেলাম ভ্যালি অফ কুইন্সে আমেন-খপ-শেফ নামে এক রাজকুমারের সমাধিতে৷ এই রাজকুমার তৃতীয় রামেসিসের বড়ছেলে৷ অল্পবয়সে মারা যায়৷ এর সমাধিটা ছোটো৷ কিন্তু সমাধিমন্দিরের দেওয়ালের ছবি প্রায় পুরোটাই অক্ষুন্ন আছে৷ আমাদের ইজিপ্টোলজিস্ট ভিভিয়ান তাই এই সমাধিকে বেছে নিয়েছিল আমাদের দেখানোর জন্য৷ মাটির লেভেলের একটু নিচে সমাধির প্রবেশপথ৷ প্রথমেই একটা করিডর ঢালু হয়ে নেমে গেছে ইনার চেম্বারের দিকে৷ ভেতরে ধুপ জ্বালিয়ে রেখেছে৷ তার মিষ্টি গন্ধে ভরে আছে সমাধির ভেতরটা৷ করিডরের দেওয়ালে তাকিয়ে চোখের পলক পড়ছিলো না৷ কে বলবে এই রঙ সাড়ে তিনহাজার বছরের পুরোনো৷ যদিও আমরা দেখছিলাম কাচের আবরনের এপাশ থেকে - তবুও বুঝতে পারছি এক আশ্চর্য কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি৷ কিশোর রাজপুত্রের সাথে বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি আঁকা - যাদের কাছে তাকে মৃত্যুর ওপারে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে৷ একশো ছাব্বিশটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারলে তবে খুলবে স্বর্গের দ্বার৷ করিডর দিয়ে শেষ হয়েছে ছোটো ইনার চেম্বারে৷ সেখানে পাথরের সার্কোফেগাস (কফিন) রাখা আছে৷ এর ভেতরে মমি ছিল৷ সেটা বার করে রাখা আছে মিউসিয়ামে৷ সমাধির মধ্যে ছবি নেওয়া বারন৷ তাই ছবি দেওয়া গেলো না৷ তবে যা দেখেছি তা মনের ক্যামেরায় চিরকালের মত ধরা রইলো৷

এর পর গেলাম ভ্যালি অফ কিংসে৷ এখানেও ছবি নেওয়া যাবে না৷ আমরা গেলাম চতুর্থ রামেসিস, নবম রামেসিস আর তুতানখামুনের সমাধিতে৷ তুতানখামুনের জন্য আলাদা টিকিট কাটতে হল ৮০ ইজিপ্সিয়ান পাউন্ড দিয়ে৷ বাকিগুলো আমাদের প্যাকেজে ইনক্লুডেড৷ চতুর্থ রামেসিসের সমাধি বেশ বড়ো৷ এই সমাধি অব্যশ্য বহুদিন আগেই আবিষ্কার হয়ে গেছে৷ এমনকি আঠারো শতকে এটা হোটেল হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে৷ সমাধির মধ্যে হায়রোগ্লিফিক্সের ওপরে অনেক জায়গায় কোপটিক, ল্যাটিনে লেখা আছে৷ খ্রীষ্টান সন্যাসীদের কীর্তি৷ অনেকজায়গায় নিখুঁত ভাবে সমাধির দেওয়ালে খোদাই করা ছবি উপড়ে নেওয়া হয়েছে৷ তবে যেটুকু আছে সেটা একদম জ্বলজ্বল করছে৷ কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায়না এই ছবি তিনহাজারেরও বেশি বছরের পুরোনো৷ যে ঘরে রামেসিসের সারকোফেগাস রাখা আছে তার সিলিংএর ছবি অপুর্ব৷ মিশরীয় মিথ অনুযায়ী বায়ুদেবী নুত রোজ সন্ধ্যাকালে সুর্যদেবতা রাকে গিলে নেন আর রোজ ভোরে সুর্যদেবতা নুতের গর্ভ হতে জন্ম নেন৷ রামেসিসের সমাধির ইনার চেম্বারের সিলিংএর ছবিতে দেখা যাচ্ছে নুত রাকে গিলে নিচ্ছেন৷ তারপর সেই নুতের থেকেই আবার রায়ের জন্ম হচ্ছে৷ সুর্যের রঙ কি অসাধারন লাল৷ আকাশ উজ্জ্বল নীল৷ প্রায়ান্ধাকার ইনার চেম্বারেও সেই রঙ ঝলমল করছে৷ নবম রামেসিসের সমাধিও একইরকম৷ তবে বেশ ছোটো৷ আমাদের অশিক্ষিত চোখে খুব বেশি কিছু তফাত ধরা পড়লো না৷

তারপর গেলাম বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যত ফারাও তুতানখামুনের সমাধি দেখতে৷ খুব ছোটো সমাধি৷ তুতানখামুন তো খুব একটা বিখ্যাত রাজা ছিলেন না৷ খুব অল্প বয়সেই মারা যান৷ তুতানখামুন বিখ্যত হয়েছেন মৃত্যুর তিনহাজার বছর পরে যখন জেমস কার্টার তাঁর প্রায় অবিকৃত সমাধিমন্দির আবিষ্কার করে৷ আর কোনো ফারওএর সমাধি থেকে এতো সম্পদ পাওয়া যায়নি৷ তার মানে অবশ্য এই নয় যে তুতানখামুনের সময় মিশর কিছু অতিরিক্ত সমৃদ্ধিশালী ছিল৷ সব ফারাওদের সমাধিতেই প্রচুর ধনসম্পদ ছিলো, কিন্তু সে সবই চুরি গেছে৷ সৌভাগ্যবশত তুতানখামুনের কথা সবাই ভুলে গেছিল৷ তাই তাঁর সমাধির ওপর হামলা হয়নি৷ বিশ শতকে তাঁর সমাধির অতুলনীয় সম্পদ দেখে আজকের মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে গেছে৷ এই তুতানখামুনের ছবি আনন্দমেলার প্রচ্ছদে দেখেই আমার মিশর মুগ্ধতার সুত্রপাত৷ তুতানখামুনের সমাধির করিডরে বিশেষ ছবি নেই৷ রাজার মৃত্যু যেহেতু অপ্রত্যশিত ছিল তাই খুব তাড়াহুড়োয় বানানো হয় এই সহ্মাধি৷ ইনার চেম্বারে কাচের বাক্সে রাখা রয়েছে তুতানখামুনের মমি৷ এবছরের নভেম্বর মাসের চারতারিখে তুতানখামুনের মমি খোলা হয়েছে৷ তাই এই মুহুর্তে ইজিপ্টোলজিতে তুতানখামুনের মমি হল সবচেয়ে বড়ো খবর৷ মমি আমরা আগেও দেখেছি৷ ঐতিহাসিক গুরুত্ব যতই হোক না কেন, আমাদের অশিক্ষিত চোখে এটা যে আলাদা কিছু তা কিন্তু নয়৷ কিন্তু মাটির তলায় সমাধিমন্দিরে তিনহাজার বছরের পুরোনো কিশোরের দেহাবশেষ দেখে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো৷ তিনহাজার বছর! মহাকালের নিয়মে হয়তো কিছুই নয়৷ কিন্তু আমাদের নশ্বর জীবনে আমরা তো কল্পনাই করতে পারি না৷ আত্মাই শুধু জন্মরহিত ও শাশ্বত নয়, প্রাচীন মিশরীয়দের দেহকেও শাশ্বত করে রাখার উপায় জানা ছিল!! তুতানখামুনের সমাধির দেওয়ালের ছবিগুলো আশ্চর্য জীবন্ত৷ হয়তো মানুষের আনাগোনা বেশি হয়নি বলেই রঙ বিশেষ নষ্ট হয়নি৷ তুতানখামুনের সাথে আইসিসের ছবি আছে দেওয়াল জুড়ে৷ এতো উজ্জ্বল যে দেখে মনে হচ্ছে কালই আঁকা হয়েছে বুঝি৷

তারপর গেলাম রানী হাতশেপসুতের মন্দিরে৷ নির্দ্বিধায় প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী মহিলা৷ সাড়েতিনহাজার বছর আগে বাইশ বছর মিশরের রাজত্ব চালিয়েছেন৷ হাতশেপসুত ছাড়া আর কোন মহিলা মিশরের সিংহাসনে এতোদিন বসার কথা ভাবেও নি৷ মিশরের ইতিহাসে আরো কয়েকজন মহিলা ফারাও দেখা গেছে ঠিকই৷ কিন্তু তারা রাজত্ব করেছে ঠেকায় পড়ে - ভাই বা স্বামী উপযুক্ত হয়ে উঠলেই তাকে রাজত্ব ছেড়ে দিয়েছে৷ হাতশেপসুত রাজা হন তাঁর বাবার মৃত্যুর পর দু বছরের জন্য৷ তারপর তাঁর স্বামী তৃতীয় থথমোসিসের মৃত্যুর পর টানা উনিশ বছর এব ংএই কাজে তিনি মিশরের পুরুষপ্রধান পুরোহিততন্ত্রের সম্মতি আদায় করে ছাড়েন৷ মিশরের ইতিহাসের অন্যতম সফল বহির্বাণিজ্য হয়েছে হাতশেপসুতের রাজত্বকালে৷ ইনফ্যাক্ট রানীর এই কীর্তিকে অমর করে রাখতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এই মন্দির৷ পুণ্ট (বর্তমান সোমালিয়া) থেকে নিয়ে আসা কিছু গাছ পোঁতা হয়েছিলো মন্দিরের সামনে৷ সেই গাছ আর নেই, কিন্তু সেই জায়গা চিহ্নিত করা আছে এখনো৷ মন্দিরটাও বেশ অভিনব৷ মিশরের অন্যান্য মন্দিরগুলোর থেকে অন্যরকমের আর্কিটেকচার৷ তিনতলা মন্দির৷ অনেকটাই ভেঙে গেছে৷ কিছু ভেঙে দেওয়া হয়েছে৷ কিছু ভেঙে পড়েছে ধ্বস নেমে৷ এই প্রসঙ্গে বলে রাখি হাতশেপসুতের মৃত্যুর পর তার নাম মিশরের রাজপরিবারের রেকর্ড থেকে মুছে দেওয়া হয়৷ তার রাজত্বকালে যা কিছু প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার অধিকাংশ থেকে তার নাম মুছে দিয়ে চতুর্থ থথমোসিসের নাম লেখা হয়৷ কিন্তু সেই মুর্খেরা "he" গুলোকে "she" করতে ভুলে গেছিল৷ কালের বিচারে তাদের ছলনা তাই শেষপর্যন্ত টিকলো না৷ হাতশেপসুত প্রকাশ পেলেন স্বমহিমায় তাঁর সময়ের সাড়ে তিনহাজার বছর পরে৷ হাতশেপসুতের মন্দিরের হায়রোগ্লিফিক্স অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে৷ মূল স্ট্রাকচারটা রয়েছে৷ তারই ছবি তুললাম৷ রোমাঞ্চিত হলাম সাড়েতিনহাজার বছর আগে পৃথিবীর প্রথম মহিলা শাসকের কথা ভেবে৷

রোদ চড়া হয়ে উঠেছে৷ এই নভেম্বর মাসেও ঘাম হচ্ছে৷ খিদেও পেয়েছে তেমন৷ সবাই শিপে ফিরে খাওয়ার জন্য ব্যস্ত৷ ফেরার পথে বাস থামলো কলোসি অফ মেমননের সামনে৷ নামটা গ্রীক শোনালেও এটা আসলে ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপের দুটো বিরাট মুর্তি৷ প্রায় ষাট ফুট উঁচু এই মুর্তি একটা মাত্র পাথর কেটে বানানো৷ এখন অবশ্য দেখে বোঝা যাবে না সেটা৷ একসময় ভুমিকম্পে এই মুর্তি ভেঙে যায়৷ তখন কোন একটা ফাটল দিয়ে হাওয়া ঢুকে কান্নার মতো আওয়াজ বেরোতো৷ গ্রীকরা এই কানা শুনে ওদের আগামেমননের গল্পের সাথে সেটা রিলেট করে নাম দিয়েছিল কলোসি অফ মেমন্নন৷ তারপর রোমান আমলে এই মুর্তির রিকনস্ট্রাকশনের সময় ফাটল জুড়ে যায়৷ আওয়াজও বন্ধ হয়৷ মেমনন আর কাঁদে না৷ ভাঙা মুর্তিদুটো অতীত গৌরবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার সামনে ছবি তুললাম৷ মাত্র একটা পাথর কেটে কি করে বানানো যায় এই ষাটফুট উঁচু মুর্তি সাড়ে তিনহাজার বছর আগের টেকনোলজিতে - সেকথা ভেবে আবারও কোন কুলকিনারা করতে পারলাম না৷

ফিরে এসে এই প্রথম আমাদের কেবিনের ঘরে ঢুকলাম৷ আমাদের জাহাজের নাম কিং অফ থিবস৷ বেশ সুন্দর কেবিন৷ জানলা খুলে দিলেই সেটা ডেক হয়ে যাচ্ছে৷ ডেক থেকে উঁকি মারলাম নীলনদে৷ সেই ছোটোবেলা থেকে গঙ্গার পরেই সবচেয়ে পরিচিত নদী বোধহয় নীলনদ৷ গঙ্গা এতো ছোটো থেকে দেখছি যে প্রথম দেখার স্মৃতি বলে আলাদা কিছু নেই৷ নীলনদ দেখে অদ্ভুত লাগছিলো৷ একটা নদী, যে নদী এতোদিন শুধু কল্পনাতেই ছিলো - সেই নদী চোখের সামনে৷ পৃথিবীর দীর্ঘতম এই নদী - এই নদীর বুকে গড়ে উঠেছে প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত মানবসভ্যতা৷ সেই মানুষেরা এমন কাজ করে গেছে যা আমরা আজকের দিনেও করার কথা ভাবতেও পারবো না৷

এতো টায়ার্ড ছিলাম যে ভালো করে খেতেও পারলাম না৷ ঘরে ফিরে আধঘন্টা শুয়েই বেরিয়ে পড়তে হল৷

এবার গন্তব্য কার্নাক টেমপেল কমপ্লেক্স৷ প্রাচীন পৃথিবীর ধর্মস্থানগুলোর মধ্যে বৃহত্তম৷ প্রায় মাইলখানেক ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই মন্দির৷ প্রধান উপাস্য দেবতা আমুন-রা ছাড়াও মুত এবং আরো কিছু দেবতার মন্দির রয়েছে৷ মিশরের প্রায় সব রাজাই এই মন্দির সৃষ্টিতে কনট্রিবিউট করেছেন৷ রামেসিসের আমলে যে অংশ তৈরী হয়েছে সেখানে রামেসিসের দুটো বিশাল মুর্তি আছে৷ তার একটা এখনো প্রায় অবিকৃত৷ মন্দিরের গায়ের হায়রোগ্লিফিক্সও অনেক জায়গাতেই প্রায় অবিকৃত রয়েছে৷ রং প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে৷ মাঝে মাঝে সিলিংএর কিছু কিছু জায়গায় রং বোঝা যায় এখনো৷ আমরা তার ছাবি নিয়েছি৷ দুটো ওবেলিস্ক (এক পাথরের তৈরী উঁচু পিলার) আছে৷ একটা রামেসিসের আমলে তৈরী৷ আরেকটা হাতশেপসুতের আমলে৷ হাতশেপসুতের তৈরী ওবেলিস্কটা রানীর মৃত্যুর পর পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায় যে সেই ওবেলিস্ক হাতশেপসুতের বানানো৷ কিন্তু ভুমিকম্পে সেই পাথরের দেওয়াল ভেঙে পড়ে আর প্রকাশ হয়ে যায় মিশরের সবচেয়ে বিতর্কিত ফারওএর অমর কীর্তি৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে যেখানে পুজো হত সেই ঘর মোটমুটি অক্ষত আছে৷ খুব ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার - গর্ভগৃহের দেওয়ালে আলেকজান্ডারের সাথে আমুন-রার ছবি৷ অর্থাত্ গ্রীক আমলেও এই মন্দিরে পুজো হয়েছে৷ আলেকজান্ডার আমুনের মন্দিরে পুজো দিয়ে আরোগ্য কামনা করেছেন৷ গর্ভগৃহের পেছনে বিশাল উঠোন৷ সেখানে পুজোর সময় নাচগান হত - যেগুলো পুজোর রিচুয়ালেরই অঙ্গ ছিল৷কর্নাক মন্দিরের যেটা সবচেয়ে অভিভুত করলো আমাদের তা হল এর বিশালত্ব৷ বিশাল উঁচু উঁচু পিলার৷ তার গায়ে হায়রোগ্লিফিক্স৷ পড়ন্ত সুর্যের আলো এসে পড়েছে ওবেলিস্কের চুড়ায়৷ মনে হচ্ছিল সেই যুগে চলে গেছি৷ আমুন রার পুরোহিতরা এখনি দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারন করতে করতে বেরিয়ে আসবে গর্ভগৃহ থেকে৷

কার্নক টেম্পল দেখার পরেও যে কিছু দেখে ভালো লাগতে পারে তা ভাবি নি৷ ভুল ভাঙলো বাস এসে যখন দাঁড়ালো লুক্সর টেম্পলে৷ তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে৷ লুক্সর টেম্পল আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে৷ অসাধারন লাগছে মন্দিরের প্রবেশপথের দুইপাশে দ্বিতীয় রামেসিসের বিশাল মুর্তিদুটোকে৷ লুক্সরের মন্দির প্রাচীন কালে কর্নাক মন্দিরের সাথে আড়াই কিলোমিটার লম্বা একটা রাস্তা দিয়ে যুক্ত ছিল৷ সেই রাস্তার দুইপাসে ভেড়ার মাথাওয়ালা স্ফিংক্সের মুর্তির সারি৷ রাস্তার নাম তাই স্ফিংক্স অ্যাভেনিউ৷ কার্নাক মন্দিরে এই স্ফিংক্স অ্যাভেনিউর কিছু অংশ আমরা দেখেছি৷ আরো কিছুটা দেখা গেল লুক্সর মন্দিরের সামনে৷ বাকি স্ফিংক্স অ্যাভেনিউ ঢাকা পড়ে আছে বর্তমান লুক্সর শহরের নিচে৷ এই প্রসঙ্গে বলে রাখি আরবীতে লুক্সর কথার অর্থ প্যালেস৷ হয়তো এই মন্দিরগুলো দেখেই এমন নাম দেওয়া হয়েছিল৷ লুক্সর মন্দির প্রায় পুরোটাই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল বালির নিচে৷ মুসলিম আমলে এই মন্দিরের ওপরে একটা মসজিদ তৈরী হয়৷ সেই মসজিদ এখনো অটুট আছে৷ শুধু তার তলায় খুঁজে পাওয়া গেছে তিনহাজার বছরের পুরোনো পেগান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ৷ লুক্সর মন্দির কার্নাকের থেকে অনেক ছোটো, কিন্তু স্টাইলটা একই রকম৷ সেই রকমই একজোড়া ওবেলিস্ক৷ যার একটা আঠারো শতকে এখান থেকে উপড়ে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্রান্সে - প্যারিসের রাস্তার শোভাবৃদ্ধি করতে৷ রয়েছে সেই রকমই উঁচু উঁচু পিলার৷ কিছুদিন আগে এই রকম একটা পিলারের রিকনস্ট্রাকশনের সময় মাটির নিচে পোঁতা কিছু মিশরীয় দেবতার মুর্তি পাওয় গেছে৷ হয়তো রোমান আক্রমনের সময় পুরোহিতরা বিধর্মীর হাত থেকে দেবতাকে বাঁচাতে মাটির তলায় লুকিয়ে রেখেছিল৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে কিছু অংশে হায়রোগ্লিফিক্স মুছে ফেলে তার ওপর লাস্ট সাপারের ছবি আঁকা হয়েছে৷ সম্ভবত রোমান আমলে খ্রীষ্টান সন্ন্যাসীদের কীর্তি৷ অদ্ভুত লাগছিল তিনহাজার বছরের পুরনো মিশরীয় মন্দিরে ইসলাম আর খ্রীষ্টান ধর্মপ্রচারকদের সহাবস্থান দেখে৷ ক্লাস টেনে পড়া ঐ কবিতাটার লাইনটা মনে পড়ছিলো বারবার - "মানুষইদেবতা গড়ে, তাহার কৃপার পরে করে দেবমহিমা নির্ভর"!

লুক্সর থেকে জাহাজে ফিরেই ডিনার৷ খুব ভালো ডিনার ছিল৷ ভালো খেয়েছি৷ তারপর টানা ঘুম৷ঘুম ভাঙলো সাড়ে পাঁচটায়৷ শুভ তখন আমায় ডাকছে সানরাইজ দেখতে যাওয়ার জন্য৷ একটা হাল্কা সোয়েটার চাপিয়ে ডেকে উঠে এলাম৷ তখনো আবছা অন্ধকার৷ দুইপাশে ঘুমন্ত মিশর৷ আমরা ভেসে চলেছি নীলনদের ওপর দিয়ে৷ পাঁচহাজার বছরের মিশরীয় সভ্যতার কত উত্থানপতনের সাক্ষী এই নীলনদ৷ আজ আমরাও তার হিসেবের খাতায় ঢুকে গেলাম৷ পুব আকাশ ফরসা হয়ে সোনালী সুর্য মুখ বাড়ালো৷ আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো৷ মনে হল পাঁচহাজার বছরের কল্পনায় গড়ে তোলা সুর্যদেবতা রা আমাদের অভ্যর্থনা করলেন৷ এই পৃথিবীর প্রতিটি ধুলিকণায় মিশে আছে যে অপরিসীম বিস্ময় - সেই বিস্ময়ে বিস্মিত হওয়ার আশীর্বাদ আমরা পেয়ে গেলাম৷

ব্রেকফাস্ট খেয়ে লিখতে বসেছিলাম৷ এখন বেলা গড়িয়ে দুপুর৷ বিকেলে পৌঁছবো এডফুতে৷ সে গল্প পারলে লিখে ফেলবো আজ রাতেই৷


২০ নভেম্বর, বিকেল ৩:৪৫, অসওয়ান এয়ারপোর্ট

অসওয়ান এয়ারপোর্টে বসে আছি৷ কায়রো যাবো৷ কাল সারাদিন কায়রো ঘোরা৷ তারপর মিশরকে বিদায় জানিয়ে ঘরে ফেরা৷ গত দুদিন যে কেমন ভাবে কেটে গেল! সারাদিন নীলনদে ভেসে বেড়ানো৷ মাঝে মাঝে তরী ভিড়ছে তীরে৷ দুহাজার বছরের পুরোনো মানুষের অপুর্ব সৃষ্টি ভেসে উঠছে চোখের সামনে৷ এখানে সবাই দেখছি ভারতীয়দের বেশ পছন্দ করে৷ পরশু সালোয়ার কামিজ পড়েছিলাম৷ সন্ধ্যাবেলা আমাদের বোট এডফু পৌঁছালে আমরা টাঙ্গায় চেপে চললাম হোরাসের মন্দির দেখতে৷ এডফু একেবারে পশিমবঙ্গের সাধারন মফস্বল শহরের মতই৷ রাস্তার মোড়ে মোড়ে, দোকান ঘরের সামনে ছেলেছোকরাদের জটলা৷ আমাদের দেখেই তারা চেঁচিয়ে উঠছে "ইণ্ডিয়া! অমিতাভ বচ্চন! রানী মুখার্জী!!" যা বুঝলাম বলিউডের দেবতারা বেশ ভালই পুজো পান এখানে :)

এডফুর হোরাসের মন্দির দুহাজার বছরের পুরোনো৷ এবং রঙ বাদে প্রায় পুরোটাই অক্ষত৷ হোরাসের গল্প আগেই বলেছি৷ মৃত্যুদেবতা ওসিরিস আর শুশ্রুষার দেবী আইসিসের ছেলে৷ যে বড়ো হয়ে তার বাবা ওসিরিসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে কাকা সেথকে মেরে৷ হোরাস তাই মিশরীয়দের কাছে অশুভশক্তিকে হারিয়ে শুভশক্তির জয়ের প্রতীক৷ হোরাস মন্দিরের দেওয়ালে হায়রোগ্লিফিক্সে হোরাসের সেথবধের কাহিনী লেখা৷ আর তার পাশে পাশে সেই কাহিনীর বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি আঁকা৷ মন্দিরটা যেহেতু প্রায় পুরোটাই অক্ষত আছে তাই আমরা প্রাচীন মিশরীয়দের পুজাপদ্ধতির বেশ খানিকটা আন্দাজ পেলাম৷ হিন্দুদের পুজোর সাথে ভীষন মিল৷ আমাদের মতই নৈবেদ্য সাজানোর ঘর, মন্দির প্রাঙ্গন, গর্ভগৃহ৷ গর্ভগৃহে প্রধান পুরোহিত ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারবে না৷ হিন্দুদের মতই ঠকুরকে চান করানো, নতুন পোষাক পরানো, ভোগ দিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ঠাকুরের খাওয়ার অপেক্ষা করা এবং সব শেষে প্রসাদ বিতরন৷ এই সব রিচুয়াল অবশ্য সবই লোপ পেয়েছে দুহাজার বছর আগে৷ মন্দিরের হায়রোগ্লিফিক্সে আর পুজাপদ্ধতির অজস্র ছবিতে প্রমান রয়ে গেছে৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে একটা ভীষন সুন্দর কাঠের নৌকা রয়েছে৷ মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল এই নৌকা চেপে হোরাস তার কাকা সেথকে বধ করেন৷ এই নৌকা তাই পবিত্র৷ দুহাজার বছরের পুরোনো নৌকার গঠন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম৷

সেদিন আমাদের ক্রুজে ইজিপশিয়ান ডিনার ছিল৷ দুর্দান্ত খেলাম৷ কালোজিরে দেওয়া একরকম রুটি - অনেকটা আমাদের খাস্তা নিমকির মত৷ তারপর বেগুন ভেজে তার সাথে পেয়াজ দিয়ে একটা ঠান্ডা স্যালাড বানিয়েছিল৷ সেটাও দারুন৷ ওদের বিফের প্রিপারেশন তো ভালো বটেই৷ মাছটাও খুব ভালো বানিয়েছিল৷ বাবা গানুজ ছিল৷ সাদা তিল বেটে একটা সস বানিয়েছিল৷ সেটাও খুব ভালো খেলাম৷ সব শেষে প্রান ভরে বাকলাভা খেয়েছি :)

ওহো - বলতে ভুলে গেছি৷ দুপুরে বোট যখন লকগেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তখন দেখি একগাদা ছোটো ছোটো নৌকা আমাদের ছেঁকে ধরেছে৷ ঐ নৌকাগুলো আসলে ছোটো ছোটো দোকান৷ দোকানীরা নৌকো থেকে আমাদের ডেকে ছুঁড়ে দিচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরা গালাবা আর জিলাবিয়া৷ গালাবা আর জিলাবিয়া হল ট্র্যাডিশনাল মিশরীয় পোষাক৷ ছেলেদের গালাবা আর মেয়েদের জিলাবিয়া৷ দুটো ই পা পর্যন্ত লম্বা আলখল্লা টাইপের পোষাক৷ রাতে আমাদের ক্রুজে ইজিপসিয়ান নাইট ছিল৷ তাই অনেকেকেই কিনে নিল পার্টির পোষাক৷ আমিও আমার কেবিনের জানলা দিয়ে কিনে নিলাম একটা শাল৷ নৌকা থেকে প্লাস্টিকে ভরে আমায় শাল ছুঁড়ে দিল৷ প্রথমে চাইলো দুশো ইজিপশিয়ান পাউন্ড৷ শুভ সেটাকে দরাদরি করে পঞ্চাশে নামিয়ে আনলো৷ প্লাস্টিকে ভরে টাকা ছুঁড়ে দিলাম নৌকায়৷

কাল সারা সকাল সেলিং৷ সাড়ে এগারোটা নাগাদ কেবিনের জানলা দিয়ে দেখি নীলনদের কোলে ভেসে উঠছে এক অপুর্ব স্থাপত্য৷ যেন টুকরো টুকরো কল্পনা জুড়ে পিছিয়ে গেলাম দুহাজার বছর৷ তরী ভিড়লো কম-অম্বোতে কুমিরের মুখওয়ালা দেবতা সোবেকের মন্দিরে৷ এই মন্দির আসলে একজন নয় - দুই দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত - হোরাস আর সোবেক৷ হোরাসের মা হল শুশ্রুষার দেবী আইসিস৷ এই মন্দির তাই একসময় হাসপাতাল হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে৷ মন্দিরের পেছনের দেওয়ালে বিভিন্ন সার্জিকাল ইনস্ট্রুমেন্টসের ছবি৷ তার পাশে দুই মহিলার ছবি যাদের একজন সন্তানের জন্ম দেবে, আরেকজন সন্তানের জন্ম দিয়েছে৷ হোরাসের সাথে এখানে আরো আছে হোরাসের স্ত্রী হেথারের ছবি৷ হেথারও মাতৃত্ব আর মমতার দেবী৷

মিশরের আরো অনেক মন্দিরের মত এই মন্দিরের দেওয়ালেও লোটাস, প্যাপিরাস, বিভিন্ন শস্যের ছবি আঁকা৷ তার এক পাশে রাজার, আরেকপাশে দেবতার ছবি৷ রাজা এই সব কিছু দেবতাকে নিবেদন করবেন৷ ভিভিয়ান আমাদের নিয়ে গেল এক জায়গায় যেখানে হায়রোগ্লিফিক্সে প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেন্ডার খোদাই করা আছে৷ বছরের প্রতিটা দিন খোদাই করা আর তার পাশে সেই দিনে দেবতাকে কি নৈবেদ্য দেওয়া হবে তার ছবি৷ আরেকটি দেওয়ালের একাংশে শুধু দুটো চোখ আর কান আঁকা আছে৷ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর সব শুনছেন, সব দেখছেন৷

কম-অম্বোর এই মন্দিরের গর্ভগৃহ দুটি৷ একটা সোবেকের জন্য৷ আরেকটা হোরাসের জন্য৷ দুই গর্ভগৃহের মধ্যে যে দেওয়াল তার ভেতরটা ফাঁপা৷ সেখানে নেমে গেছে একটা সুড়ঙ্গ৷ রাজা যাখন মন্দিরে প্রার্থনা করতে আসতেন প্রধান পুরোহিত তখন নেমে যেতেন ঐ সুড়ঙ্গে৷ রাজা দেবতার সাথে কথা বলতেন৷ দেবতার হয়ে উত্তর দিতেন পুরোহিত৷ রাজা এই চালাকিটা ধরতে পারলেও তাঁর কিছু করার ছিল না৷ এতো জানাই আছে ধর্মের আফিম রাজার তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী৷

হোরাসের মন্দিরে বেশ কিছু জায়গায় রঙ এখনো মুছে যায়নি৷ দুহাজার বছরের রোদ-জল উপেক্ষা করে এখনো ঝলমল করছে৷ আমরা যখন গেছিলাম তখন ওখানে আমরা ছাড়া আর কেউ ছিল না৷ নীলনদের হাওয়া দুহাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের গন্ধ বয়ে আনছিল৷ প্রায় ফাঁকা মন্দিরে আমরা দুজনে অনেকক্ষন ঘুরে বেড়ালাম৷ একটা ঘুপচি ঘরে স্টেথোস্কোপ কানে দেওয়া এক ডাক্তারের ছবি পাওয়া গেল৷ তার পাশে ঐ রকমই একটা অন্ধকার ঘরে এক রানীর ছবি দেখিয়ে স্থানীয় এক মানুষ বললো ক্লিওপেট্রা৷ সত্যি করেই ক্লিওপেট্র কিনা জানি না, তবে লোকটা দুই ডলার বখশিশ আদায় না করে পিছু ছাড়লো না৷ আমরাও বোটে ফিরে এলাম৷ ভেসে চললাম অসওয়ানের দিকে৷


২২ নভেম্বর, দুপুর ১২:৩৮, ফেরার বিমানে অ্যাটলান্টিকের ওপর

আজ ফিরছি৷ খানিক পরেই নিউ ইয়র্ক পৌঁছাবো৷ সাত দিনের এই মিশর ভ্রমনে মন এমন কানায় কানায় ভরে আছে যে ঘরে ফিরে কাজে মন দেওয়া মুশকিল হবে৷ ১৯ তারিখের রাতে অসওয়ান পৌঁছলাম৷ রাতে ভিভিয়ান আমাদের অসওয়ানের বিখ্যাত স্পাইস মার্কেটে নিয়ে গেল৷ মশলার গন্ধে ম ম করছে৷ আমি অবশ্য মশলা কিনিনি৷ কিছু প্যাপিরাস কিনলাম৷ এখানে বাজারে ভীষন দরদাম করতে হয়৷ ওরা যা চাইবে তার ১/৬ দিয়ে শুরু করা দস্তুর৷ আমাদের সঙ্গী আমেরিকানরা এসব দেখে ভ্যবাচ্যাকা৷ আমরা কয়েকজনের হয়ে বার্গেন করে দিলাম৷ অসওয়ানই আমাদের ক্রুসের গন্তব্য ছিল৷ ২০ সকালে ক্রুসে চেক আউট৷ তারপর সারাদিন অসোয়ান সাইট সিয়িং৷ বিকেলের প্লেনে কায়রো ফেরা৷

২০ সকালে প্রথমে খনিক ঘুরে বেড়ালাম ট্র্যাডিশনাল মিশরীয় নৌকা ফেলুকাতে চেপে৷ এই প্রথম নীলনদের জল স্পর্শ করলাম৷ নৌকাতেও মাঝিটি নানান জিনিসের পশরা সাজিয়ে বসেছে৷ উটের হাড়ের একটা পেপার কাটার আমার খুব পছন্দ হল৷ দাম জিজ্ঞেস করাতে সে বলে টু ফর ফোর, থী ফর ফাইভ৷ আমি বললাম থী ফর টু৷ আমার সহযাত্রীরা খুব হাসলো৷ মাঝিটি তো রেগেমেগে আমার দিকে পেছন ফিরে বসলো৷ পরে অবশ্য নৌকা থামার পর আমার দামেই দিল আমায় :) নৌকা থেকে দেখলাম একটা অদ্ভুত দ্বীপ৷ দুর থেকে মনে হচ্ছে এক পাল হাতি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ এর নাম এলিফ্যানটাইন আইল্যান্ড৷ নৌকা ভেসে চললো তার পাশ দিয়ে৷ দেখলাম সেই হোটেল যার একটা সুটে বসে আগথ ক্রিস্টি "ডেথ অন রিভার নাইল" লিখেছিলেন৷ প্রান ভরে নীলনদের হাওয়ার শ্বাস নিলাম৷ ঘন্টাখানেক পর ফিরে এলাম ঘাটে৷ সেখান থেকে আমাদের বাস ছাড়লো অসওয়ান সাইট সিয়িং করাতে৷

প্রথমে গেলাম আনফিনিশড ওবেলিস্ক দেখতে৷ আগে বলেছি বোধহয় ওবেলিস্ক হল এক পাথরের তৈরী উঁচু পিলার যার গায়ে রাজারা তাদের কীর্তির কথা লিখে রাখতো৷ আমরা যেটা দেখতে গেলাম সেই ওবেলিস্কটা অসওয়ানের গ্র্যানাইট কোয়ারীতে তৈরী হচ্ছিল৷ তারপর পাথরটাতে কোনভাবে চিড় ধরে৷ ওবেলিস্ক যেহেতু এক পাথরের হতেই হবে, সেহেতু এই ওবেলিস্কটি পরিত্যক্ত হয়৷ এটা এখনো সেভাবেই পড়ে অছে যেভাবে কয়েক হাজার বছর আগের শ্রমিকেরা এটাকে ফেলে গেছিল৷ অসাধারন দৃশ্য৷ জাস্ট অসাধারন৷ তিনটে পিঠ মসৃন ভাবে কাটা৷ চতুর্থ পিঠ মাটির সাথে এখনো জুড়ে রয়েছে৷ অবাক করলো গ্র্যানাইটের গায়ে পাথর কাটার দাগ৷ কিছুতেই বিশ্বাস হয়না এটা মানুষ হাতে কেটেছে৷ মেশিনের দাঁতের মত আয়তাকার দাগ পাথরের ওপর৷ এ জিনিস দেখার পর দানিকেনের থিয়োরী বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়৷

পরের গন্তব্য ছিল ফিলি দ্বিপে আইসিসের মন্দির৷ এটা মিশরের শেষ পেগান মন্দির৷ খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে এই মন্দিরে শেষ পুজা হয়েছে৷ তারপরে খ্রীষ্টানদের দখলে চলে যায়৷ অসওয়ান লেকের ওপর এই মন্দির অপুর্ব সুন্দর৷ এটাকে সাধারনভবে ফিলির আইসিস মন্দির বলে রেফার করা হলেও বর্তমানে মন্দিরটি ফিলি দ্বীপে নেই৷ ষাটের দশকে অসওয়ান হাই ড্যাম তৈরী হওয়ার পর জলতল বেড়ে ফিলি দ্বীপ জলের তলায় ডুবে যায়৷ তখন পুরো মন্দিরটাকে ছোটো ছোটো টুকরো করে আরেকটি অপেক্ষাকৃত উঁচু দ্বীপে তুলে এনে টুকরোগুলি জোড়া লাগানো হয়৷ নীল অসওয়ান লেকের বুকে ছোট্টো সবুজ দ্বীপটি জেগে আছে৷ তার বুকে আইসিসের মন্দির৷ স্থাপত্য এখনো অনেকটাই অবিকৃত৷

মন্দিরের দেওয়ালের ছবি থেকে দেবতার মুখ খুবলে নেওয়া হয়েছে৷ খ্রীষ্টধর্ম প্রসারের সময় যারা বাধ্য হয়েছিল ধর্মান্তরিত হতে, অথচ মনে মনে বিশ্বাস করতো মুর্তিপুজাতেই - তারা হয়তো ভয় পেয়েছিল দেবতার রোষের৷ তাই বিকৃত করে দিয়েছিল মুর্তির মুখ৷ ভেবেছিল মুখ বিকৃত করে দিলে হয়তো দেবতা আর দেখতে পাবেন না তাদের৷ আরেকটা ইন্টারেস্টিং তথ্য বলে নিই এই ফাঁকে৷ প্রাচীন পেগান সভ্যতাগুলোর মত মিশরীয়রাও বিশ্বাস করতো সিমেট্রিতে৷ তাই মিশরীয় মন্দিরগুলো বামদিকটা অনেকসময়ই ডানদিকের মিরর ইমেজ৷ অনেক মন্দিরের ধ্বংসস্তুপে তাই দেখেছি শুধু বামদিকটা বা শুধু ডানদিকটা বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে৷ একদিকটা নষ্ট করে দিলেই সিমেট্রি নষ্ট হয়ে গেল৷ আর সেই সাথে নষ্ট হয়ে গেল সংশ্লিষ্ট দেবতার শক্তিও - এই রকমই বিশ্বাস৷

আইসিসের মন্দিরের দেওয়ালে দেখেছি ল্যাটিন-কোপটিকে লেখা অজস্ব গ্রাফিতি৷ বেশকয়েকটা পিলারে পুরোনো ছবিকে মুছে দিয়ে খোদাই করা আছে ক্রশ৷ তবে সেই ক্রশ কিন্তু আমরা এখন যে ক্রশ দেখি সেই রকম নয়৷ সিমেট্রিক ক্রশ৷ চারটে বাহুই সমান, একইরকম৷ বুঝতে পারছিলাম যুগপরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষনের সাক্ষী হয়েছি৷ এই প্রসঙ্গে একটা নিজস্ব অবসারভেশনের কথা লিখে আইসিস মন্দিরের গল্প শেষ করি৷ প্রায় সব মিশরীয় দেবতাই হাতে একটা বিশেষ চিহ্ন ধরে আছেন দেখলাম৷ এর নাম ankh ৷ এই চিহ্নের অর্থ হল iternal life ৷ এখন আমরা যে ক্রশ চিহ্ন দেখি তার সাথে ankh এর ভীষন মিল৷ আমাদের গ্রুপের একটি মেয়ে ankh পরেছিল গলায় লকেট করে৷ আমি প্রথমে সেটাকে ক্রশ ভেবেছিলাম৷ আমাদের গাইড ankh এর দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করার পর বুঝলাম মেয়েটি ankh পরেছে৷ ankh এর ওপরের অংশ একটা চোখের মত৷ বাকি অংশ সাধরন ক্রশের মত অ্যাসিমেট্রিক৷

এর পর আর বিশেষ কিছু দেখার ছিল না সেদিন৷ পথে অসওয়ান হাই ড্যামে বাস থামলো একবার৷ বিশাল এই ড্যামের পাশেই মানুষের তৈরী পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো জলশয় লেক নাসের৷ মিশরের রুক্ষ দক্ষিনপ্রান্তে এই জলাশয় মিশরের বর্তমান অর্থনীতিতে অসামন্য গুরুত্বপুর্ন হলেও প্রাচীন মিশরের নেশায় এমন বুঁদ হয়েছিলাম যে এই লেকটির দিকে বিশেষ মন দিতে পারলাম না৷ বাস চললো এয়ারপোর্টে৷ পড়ন্ত বিকেলের আলোয় রুক্ষ ধুষর অসওয়ানকে বিদায় জানিয়ে আমরা উড়ে চললাম কায়রোর দিকে৷


২৬ নভেম্বর, ব্যাটেলক্রিক, সকাল ৯:৩৭

মিশর থেকে ফিরেছি তিনদিন হয়ে গেল৷ আসার পর থেকেই সেমেস্টার শেষের চাপ আর বাড়ী ফেরার অপরিসীম আলস্য যেভাবে একসাথে সাঁড়াশী আক্রমন চালিয়েছিল যে ভাবছিলাম আমার আরো পাঁচটা কাজের মত এই মিশর ডায়েরীও অসমাপ্ত রয়ে যাবে বুঝি৷ আজ অফিসে এসে দেখি কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ রেসপন্ড করছে না৷ কাজকর্ম শিকেয় তুলে তাই মিস্তিরীর অপেক্ষায় বসে আছি৷ আর সেই অবসরে চলছে ডায়েরী লেখা৷

২১ তারিখ সকালটা ছিল পিরামিড আর স্ফিংক্সের জন্য৷ ভোরে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে দেখি হোটেলের লবি থেকে পিরামিড দেখা যাচ্ছে৷ ব্রেকফাস্ট খাওয়া মাথায় উঠলো৷ ছবি তুলতে ছুটলাম৷ তারপর সত্যিই যখন বাসে চেপে বসলাম আর আমাদের গাইড জানালো আমরা এখন চলেছি গিজাতে যেখানে ইচ্ছা করলে পিরামিডের ভেতরেও আমরা ঢুকতে পারি তখন মনে হচ্ছিল আমার হার্টবিটের শব্দ বুঝি বাসের ড্রাইভারও শুনতে পাচ্ছে৷ গিজার সবচেয়ে বড়ো পিরামিড যেটাকে আমরা খুফুর পিরামিড বলে জানি সেটার ভেতরে ঢোকার দক্ষিনা ১০০ ইজিপসিয়ান পাউন্ড৷ আর তার পাশের পিরামিডটি যেটা খুফুর পিরামিডের থেকে সামান্যই ছোটো - সেই খেফরনের পিরামিডে ঢুলতে লাগে মাত্র ২৫ ইজিপসিয়ান পাউন্ড৷ সঙ্গত কারনেই তাই ঠিক হল আমরা খেফরনের পিরামিডের ঢুকবো৷ খেফরনের পিরামিডের চূড়ার কাছে অরিজিনাল লাইমস্টোনে কেসিং এখনো রয়ে গেছে৷ একসময় প্রতিটা পিরামিডের গায়েই মসৃন লাইমস্টোনের আস্তরন ছিল৷ সূর্যের আলো পড়ে দিনের বেলা সেটা ঝলমল করতো৷ ভুমিকম্পে এই আস্তরন ভেঙে যায়৷ এখন তাই সবকটা পিরামিডের অমসৃন এবড়ো খেবড়ো বহিরাবরনটুকুই আমরা দেখতে পাই৷ শুধুমাত্র খেফরনের পিরামিডের চূড়াতে কিছু অংশে এখনো ঐ লাইমস্টোনের আস্তরনটি রয়ে গেছে৷ তবে এখন আর সেটা সুর্যের আলো পড়ে ঝলমল করে না৷

পিরামিডের সামনে একটা ছোটো কি-অস্কে টিকিট বিক্রি হচ্চে৷ টিকিট কিনে আমরা লাইনে দাঁড়ালাম৷ ভিভিয়ান আমাদের আগেই সাবধান করে দিয়েছিল পিরামিডে ঢোকার পথ একটা ছোটো সুড়ঙ্গের মত৷ পাশাপাশি বড়জোর দুজন চলতে পারে৷ ছাদ এতো নিচু যে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে হবে৷ ভেতরে কোন ভেন্টিলেশন নেই৷ তাই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে পারে৷ ভিভিয়ানের কথা একান দিয়ে ঢুকে ওকান দিয়ে বেরিয়ে গেছে৷ মিশরে এসে সুযোগ পেয়েও পিরামিডে ঢুকবো এ আবার হয় নাকি৷ আর গাইডেরা অনেক সময়েই বাড়িয়ে বলে৷ সেবারে ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে রাইড নেওয়ার সময়েও অনেকে সাবধান করেছিল৷ কিছুই তো হয়নি৷ ভিভিয়ান যে ফাঁকা বুলি আওড়ায়নি সেটা বুঝলাম একটু পরেই৷ বড়োজোর তিনফুট চওড়া সুড়ঙ্গের একদিক দিয়ে মানুষ ঢুকছে, অন্যদিক দিয়ে বেরোচ্ছে৷ সুড়ঙ্গটি আবার সোজা নয়, সেটা বেঁকে গেছে নিচের দিকে৷ দেওয়ালে খানিক দুরে দুরে আলো লাগানো আছে বটে, কিন্তু মোটের ওপর জায়গাটা অন্ধকার৷ এতো লোকের আনাগোনায় একটা ভ্যপসা বাষ্প তৈরী হয়েছে যেটা আমায় ক্লস্টোফোবিক করে তুলছিল৷ পিঠ বেঁকিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল এ পথের বুঝি আর শেষ নেই৷ অথচ সত্যি করে হয়তো বড়োজোর তিনমিনিট হেঁটেছি৷ সুড়ঙ্গ একসময় একটা ছোটো সমতল কুঠুরীতে এসে শেষ হল৷ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম৷ এখানে পাথরের দেওয়ালের গায়ে একটা ছোটো কুলুঙ্গীর মত৷ আর আমাদের ডানদিকে আরেকটা সুড়ঙ্গ অন্য একটা ঘরে চলে গেছে৷ সেটার দরজা বন্ধ৷ আন্দাজে মনে হল এটা রানীর সমাধি৷ কারন শুনেছিলাম রানীর সমাধিকক্ষটি বেশ ছোটো এবং সেটা বন্ধ আছে৷ কুঠুরী থেকে আরেকটা সুড়ঙ্গ এবার চলে গেছে ওপরের দিকে৷ সেই সুড়ঙ্গ ধরে চলতে শুরু করলাম৷ দেখলাম পিঠ বেঁকিয়ে ওপরের দিকে ওঠা অপেক্ষাকৃত সোজা৷ এবার কম কষ্ট হল৷ সুড়ঙ্গ শেষ হয়েছে একটা মাঝারী আকারের ঘরে৷ সেখানে একটা পাথরের সার্কোফেগাস (কফিন) রাখা৷ ব্যাস৷ আর কিছু নেই৷ চারহাজার বছর অগে হয়তো এই ঘরটিকে সোনাদানায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল৷ হয়তো সমাধিকক্ষে, সুড়ঙ্গের দেওয়ালে জ্বলজ্বল করছিল ওসিরিসের সভায় শেষ বিচারের ছবি৷ এখন আর সেসবের কিছুই নেই৷ কালো পাথরের সার্কোফেগাসটার কাছে গিয়ে খানিকক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম৷ ভ্যপসা সুড়ঙ্গপথ৷ তার শেষে এই অপ্রশস্ত প্রায়ন্ধকার সমাধিকক্ষ৷ মনে হচ্ছিল সত্যিই অন্য এক দুনিয়াতে চলে এসেছি৷ অতো লোকের মাঝেও গা ছমছম করছিল৷ হতে পারে মুক্ত বাতাসের অভাবে৷ হতে পারে এতোক্ষন কুঁজো হয়ে হাঁটার জন্য৷ হতে পারে এতোদিনের পড়া গল্প আর সত্যিকরে পিরামিডের ভেতরে পা ফেলার অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল বলে৷ শেষবারের মত ফারাও খেফরনের গোপনতম ঠিকানায় চোখ বুলিয়ে ফেরার পথ ধরলাম৷ আবার সেই বদ্ধ সুড়ঙ্গ৷ কতক্ষনে সুর্যের আলো দেখবো সেই আশায় হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলা৷

পিরামিড থেকে ঘুরে আসার পাঁচ দিন পর এই লেখা লিখছি৷ এখনো ঘোর কাটেনি আমার৷ লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স কাকে বলে তা প্রথম বুঝেছিলাম ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে যখন পুর্ণ সুর্যগ্রহনের চুড়ান্ত মুহুর্তটিতে আকাশ-বাতাস এক অপার্থিব নীলাভ দ্যুতিতে ঢেকে গেছিল৷ আবার বুঝলাম ২০০৭ এর ২১শে নভেম্বর পিরামিডের মধ্যে পা রেখে৷ এ এমন এক বিস্ময়কর অনুভুতি যা লিখে প্রকাশ করবো এমন ভাষা আমার জানা নেই৷ দুটো ই যেন এক অন্য পৃথিবী থেকে ঘুরে আসা৷ এক চুড়ান্ত বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে যাওয়া৷

অনেক প্রশ্ন ছিল মনে৷ কিছুই জিজ্ঞাসা করা হলনা ভিভিয়ানকে৷ এখন মনে হচ্ছে জানতে পারলে ভালো হত মিশরে সহমরন ছিল কিনা৷ রানীকে কি তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর পিরামিডে নিয়ে গিয়ে সমাধি দেওয়া হত, নাকি কোন বিভত্স প্রথা জড়িয়ে ছিল এর সাথে যা ভাবতে গেলেও এখন আমার হাড় হিম হয়ে আসছে৷ প্রশ্ন জাগছে ঐ সুড়ঙ্গ আর সমাধিকক্ষটুকু বাদ দিলে বাকি পিরামিডটা কি ফাঁপা? কিছুই জেনে নেওয়া হয়নি৷ ঐ সরু সুড়ঙ্গের ওপারের মৃত্যুপুরী আমায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল৷ পিরামিড থেকে বেরোনোর পর ভিভিয়ান আমাদের নিয়ে এলো আরেকটা স্পটে যেখান থেকে স্ফিংক্সকে দেখা যায়৷

স্ফিংক্স এক বিশাল পাথরের সিংহ যার মুখটা মানুষের৷ মিশরের ইতিহাস দাবী করে এই মুখ ফারাও খেফরনের৷ আজকের ঐতিহাসিকরা অন্য কথা বলেন৷ তাঁরা বলেন এ আসলে কোন পুরুষের মুখই নয়৷ এই মুখ এক আফ্রিকান নারীর৷ এই মুখ খোদাই হয়েছে ফারাওদেরও আগের যুগে৷ তারপর আর সব তথাকথিত উন্নত সভ্যতার মতই মিশরীয় সভ্যতাও আদিবাসীদের এই কীর্তিকে নিজেদের বলে চালিয়েছে৷ ফিংক্সের নাকটা ভাঙা৷ ভাঙা নাকে অনেক পায়রা বাসা বেঁধে আছে :) স্ফিংক্সকে আরো কাছ থেকে দেখতে হলে খেফরনের ভ্যালি টেম্পলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে৷ ভ্যালি টেম্পল হল সেই যায়গা যেখানে মমি তৈরী হত৷ প্রত্যেক পিরামিডের সাথেই একটি সংলগ্ন ভ্যালি টেম্পল আছে৷ এখানেই মস্তিষ্ক, পাকস্থলি, অন্ত্র আর ফুসফুস মৃতের শরীর থেকে বার করে চারটি আলাদা পাত্রে ভরে মমি করে মৃতের কফিনের সাথে দিয়ে দেওয়া হত৷ বাকি শরীরটা নুন আর আরো বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হত চল্লিশ দিন৷ কি সেই রাসায়নিক যা তিনহাজার বছর ধরে একটা দেহকে টিকিয়ে রাখতে পারে তা আজকের বিজ্ঞান এখনো জানে না৷ তারপর লিনেনে জড়ানো হত সেই দেহ৷ হাতের আঙুল, কনুইএর মত ভঙ্গুর অংশ মুড়ে দেওয়া হত সোনার পাতে৷ তারপর সেই মমি ঢুকতো কফিনে৷ হয়তো সোনার কফিনে৷ যার একমাত্র নিদর্শন আমরা দেখেছি তুতানখামুনের সমাধিতে৷ বাকি সবকটি আবিষ্কৃত সমাধি গবেষনার সুযোগ পাওয়ার আগেই লুঠ হয়ে গেছে৷ তবে তুতানখামুনের মত নগন্য কিশোরের সমাধিতে যদি ঐ অতুলনীয় সম্পদ পাওয়া গিয়ে থাকে তাহলে খুফুর মত ফারাও যিনি কম করে ২০ বছর রাজত্ব করেছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পিরামিড বানিয়েছেন - তার সমাধিতে কত সোনাদানা দেওয়া হয়েছিল তা আমাদের চিন্তারও বাইরে৷

স্ফিংক্সের কথায় ফিরে আসি৷ ভ্যালি টেম্পলের পেছনের একটা দরজা দিয়ে বেরোতেই স্ফিংক্স একেবারে চোখের সামনে চলে এলো৷ স্ফিংক্স যে কত বিশাল তা এতোক্ষনে বুঝতে পারলাম৷ আর আরো অবাক করে দেওয়া ঘটনা হল এই বিশাল স্ফিংক্স কিন্তু পিরামিডের তুলনায় বেশ ছোটো৷ তিনটে পিরামিড আর স্ফিংক্স সহ সাহারার এই প্রান্ত এতো বিশাল যে আমাদের এতোদিনের বিশালত্বের ধারনা ওলটপালট হয়ে যায়৷ নিউ ইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং বা শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার আমার মনে এই বিস্ময়ের জন্ম দেয়নি যদিও এই দুটো ই পিরামিডগুলোর চেয়ে অনেক উঁচু৷ রুক্ষ সাহারার বুকে সাড়ে চারহাজার বছরের পুরোনো মানুষের কীর্তিস্তম্ভ আমার মধ্যবিত্ত ধ্যানধারনায় সজোরে ধাক্কা মারে৷ আমার ঘোর কাটে না৷


২৭ নভেমবর, কালামাজু, রাত ৯:৪২

মিশরের গল্প প্রায় শেষ হয়ে এলো৷ গিজা থেকে ফেরার পথে ভিভিয়ান আমাদের নিয়ে গেল একটা এসেন্স শপে৷ বাহারী কাঁচের আতরদানীতে ভরা সেই দোকান যেন আরব্য উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে৷ সুদৃশ্য পেয়ালায় টার্কিশ কফিতে আমাদের আপ্যায়িত করে দোকানদার আমাদের এক হারিয়ে যাওয়া সুগন্ধির গল্প শোনাতে বসলো৷ লোটাস ছিল প্রাচীন মিশরের আদরের ফুল৷ প্রায় সব মন্দিরেই তাই আমরা লোটাস আর প্যাপিরাসের ভাস্কর্য দেখেছি৷ কিন্তু পেগান সভ্যতার অবসানের সাথে সাথে প্রাচীন মিশরের এই সম্পদটিও চিরতরে হারিয়ে গেছিল৷ বিশ শতকে হাওয়ার্ড কার্টার যখন তুতানখামুনের সমাধি প্রায় অবিকৃত অবস্থায় খুঁজে পেলেন তখন আর সব জিনিসের সাথে তিনি পেলেন কিছু অ্যালবেস্টার ভাস৷ সেই ভাসের মধ্যে ছিল এক আশ্চর্য সুগন্ধি যার সুবাস তিনহাজার বছর পরেও অম্লান৷ শুধু গন্ধই নয়, অ্যালবাস্টার ভাসে পাওয়া গেল তিনহাজার বছরের পুরোনো পদ্ম আর প্যাপিরাসের বীজ৷ সেই বীজ থেকে হারিয়ে যাওয়া সুগন্ধি আবার ফিরে এলো মিশরে৷ এই বলে সে আমাদের মনিবন্ধে এক ফোঁটা করে লোটাস এসেন্স লাগিয়ে দিল৷ অপুর্ব মাদকতাময় সেই গন্ধ রাত পর্যন্ত আমার হাতে ছিল৷ আমার শ্বাশুড়ি মা সুগন্ধি ভালোবাসেন৷ তাঁর জন্য লোটাস নিলাম এক শিশি৷ আমার বরটিও ওমর শরীফ নামের একটি সুগন্ধি কিনলো৷ এর পেছনে কোন খানদানী গল্প না থকলেও গন্ধটি বড় মনোরম৷

দুপুর হয়ে গেছিল৷ প্রচুর গাছপালায় ঘেরা বাগানবাড়ির মত একটি রেস্টোরান্টে ভিভিয়ান আমাদের লাঞ্চ খাওয়াতে নিয়ে গেল৷ প্রথমেই এলো আলু কাবলির মত একটি চাট, ছোটো ছোটো ফুলো ফুলো রুটি, হামাস আর বিট দিয়ে বানানো একটা দারুন স্যালাড৷ সেটা শেষ হতে না হতেই চলে এলো মিটবল৷ দুর্ধর্ষ খেতে৷ অবিকল পাড়ার মোড়ের মাংসের চপের মত৷ আমরা দুই পেটুক আরো চেয়ে নিলাম৷ তারপরে চিকেন রোস্ট ছিল৷ কিন্তু মিটবলটা এতো ভালো লেগেছিল যে চিকেনের দিকে বেশি মন দিতে ইচ্ছা করলো না৷ সব শেষে কফি৷

খেতে খেতে দুটো বেজে গেছিল৷ কায়রো মিউজিয়াম বন্ধ হবে পাঁচটায়৷ আমরা তাই ছুটলাম মিউজিয়ামের দিকে৷ সেই ফাঁকে কায়রো শহরও দেখা হল খানিকটা দিনের আলোতে৷ কারয়োতে বেশির ভাগ বাড়িই দেখি অসমাপ্ত৷ প্রায় কোনো বাড়িরই প্লাস্টার নেই৷ ইঁটের কাঠামোর ওপর নতুন রঙ করা জানলার গ্রিল কদর্য ভাবে শোভা পাচ্ছে৷ ভিভিয়ান আমাদের বললো এখানে বেশির ভাগ মানুষই বাড়ি শেষ করেনা৷ কারন বাড়ি শেষ হলেই প্রপার্টি ট্যাক্স দিতে হবে৷ বাইরে থেকে যে বাড়িগুলোকে ইঁটের কঙ্কাল মনে হচ্ছে সেগুলোর ভেতরের ছবিটা একেবারেই অন্যরকম৷ মিউজিয়াম যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছুটা জায়গা খুঁড়ে ফ্লাইওভার বানানো হচ্ছে৷ আমার গড়িয়াহাটের কথা মনে পড়ে গেল৷ প্রচুর ট্র্যাফিক৷ এর মধ্যেই কারো কারোর সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোনোর চেষ্টা৷ কলকাতার মতই অবস্থা৷ তবে কায়রোতে পাবলিক ট্রানস্পোর্ট খুব বেশি চোখে পড়লো না৷ বাস আছে৷ ট্রামও দেখেছিলাম ১৬ তারিখ রাতে৷ কিন্তু সংখ্যায় খুব বেশি নয়৷

অবশেষে আমরা যখন মিউজিয়ামে এসে পৌঁছালাম তখন সাড়ে তিনটে বেজে গেছে৷ টিকিট কেটেই সবার আগে ছুটলাম তুতানখামুনের কালেকশন দেখার জন্য৷ আগে বলা হয়নি, তাই এই সুযোগে তুতানখামুনের কথা আরেকটু বলে নিই৷ তুতানখামুনের আসল নাম তুত-আনখ-আতুম৷ তুতানখামুনের বাবা আখেন-আতুম পৌত্তলিকতার অসারতা উপলব্ধি করে একেশ্বরবাদের প্রবর্তন করেন৷ সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নাম তিনি দেন আতুম এবং সেই নামটি নিজের ও ছেলের নামের সাথে জুড়ে নেন৷ স্বাভাবিক কারনেই মিশরের পুরোহিততন্ত্রের এই পরিবর্তন পছন্দ হয়নি৷ আখেন-আতুমের মৃত্যুর পর তার কিশোর পুত্র তুত-আনখ-আতুম ফারাও হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই পুরোহিততন্ত্র সফল হল তাদের পুরোনো দেবতা আমুনকে ফিরিয়ে আনতে৷ তখন থেকে তুত-আনখ-আতুমও তাঁর পুরোনো নাম পরিবর্তন করে তুত-আনখ-আমুন নামে পরিচিত হলেন৷

এবার ফিরে আসি কায়রো মিউজিয়ামে রাখা তুতানখামুনের সমাধির অতুলনীয় সম্পদের কথায়৷ ভ্যালি অফ কিংসে তুতানখামুনের সমাধিতে ঢুকেছিলাম ১৭ তারিখ৷ তারপর কায়রো মিউজিয়ামে সেই সমাধিতে যা যা পাওয়া গেছিল সেগুলো দেখলাম৷ এখনো পর্যন্ত ভেবে চলেছি ঐটুকু জায়গা যদি এতো জিনিসে ভরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে অন্য সব নামকরা ফারাওদের অপেক্ষাকৃত বড় সমাধিগুলোতে না জানি কত সম্পদ ছিল৷ সব কিছুর বর্ণনা দেওয়া এখানে সম্ভব হবে না৷ যেগুলো প্রথম ঝটকায় মনে আসছে সেগুলো লিখি৷ প্রথমেই মনে পড়ছে দুই প্রহরীর কথা৷ ব্ল্যাক রেজিনে তাদের গা পালিশ করা৷ পোষাক আর অস্ত্র-শস্ত্র সোনালী গিল্টি করা৷ তারা পাহারা দিচ্ছে যাতে ফারাও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন৷ মনে পড়ছে তুতানখামুনের চেয়ারগুলোর কথা৷ একটা চেয়ার প্যাপিরাসের৷ সেটা একটু ছিঁড়ে গেছে৷ বাকিগুলো সোনার পাতে মোড়া৷ সোনায় মোড়া চেয়ারের পিঠের কাছে তুতানখামুন আর তাঁর স্ত্রী আনখ-সেন-আমুনের ছবি৷ তুতানখামুন বসে আছেন, আনখ-সেন-আমুন তার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর গায়ে সুগন্ধি তেলের প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছেন৷ দুর্দান্ত কাজ৷ এখনো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে৷ সেই অ্যালবাস্টার ভাসগুলো দেখলাম যার মধ্যে লোটাস আর প্যাপিরাসের বীজ পাওয়া গেছিল৷ তিনখানা গোল্ডপ্লেটেড খাট৷ মমি তৈরীর সময় এই খাটেই শোয়ানো হয়েছিল ফারাওকে৷ তারপর আসল বিস্ময়৷ তুতানখামুনের সমাধির ইনার চেম্বারটির থেকে সামান্য ছোটো একটি গোল্ডপ্লেটেড বাক্স৷ তারমধ্যে আরেকটি বাক্স৷ তারমধ্যে আরো একটি৷ তারও মধ্যে আরো একটি৷ প্রতিটি গোল্ডপ্লেটেড৷ সবচেয়ে ছোটো বাক্সটির মধ্যে ছিল একটি গোল্ডপ্লেটেদ কফিন যেটা ১৭ তারিখ তুতানখামুনের সমাধির মধ্যে দেখে এসেছি৷ তার মধ্যে ছিল ঠিক সেই রকমই আরেকটি কফিন৷ কিন্তু এই কফিনটি নিখাদ সোনার৷ মিউজিয়ামের কাঁচের ঘরে এই কফিনটা দেখে মুখ দিয়ে কোন কথা সরছিল না৷ সোনার কফিনের গায়ে অপুর্ব কারুকার্য৷ সেমি প্রেশাস স্টোনের ছড়াছড়ি৷ তার মধ্যে আরো একটি কফিন৷ এবং এটিও সোনার৷ আয়তনে আগেরটির চেয়ে সামান্য ছোটো৷ আগেরটির মতই অসাধারন কারুকার্য৷ এটাই শেষ কফিন৷ এর মধ্যেই রাখা ছিল মমিকৃত দেহ আর সেই মমির মুখ ঢাকা ছিল সেই সোনার মুখোসে যে মুখোস থেকে আমার মিশর মুগ্ধতার সুত্রপাত৷ কাঁচের বাক্সে রাখা মুখোসটার দিকে অনেকক্ষন চেয়ে রইলাম৷ অদেখা বাল্যপেমকে প্রথম দেখার মত এক অসাড় অনুভুতি৷ কিছুই আর ভাবতে পারছিলাম না৷ আমার মিশর যাত্রা এই মুহুর্তটিতে এসে যেন পূর্ণতা পেল৷

এতোদিন যা শুধুই বইএর পাতায় বা ডিসকভারীর শোতে দেখেছি সেগুলো চোখের সামনে দেখেতে পেয়ে অবিশ্বাস্য লাগছিলো৷ বেশি সময় ছিল না৷ তাই ভিভিয়ান যেটুকু দেখালো সেটুকু দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল৷ পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সাদা পাথরের স্ল্যাবের ওপর আঁকা ছবি দেখলাম৷ পাঁচটি পাখির ছবি৷ দুটি মেয়ে৷ তিনটি পুরুষ৷ কয়েকটি পাখি জলাশয়ে খুঁটে খুঁটে শিকার করছে৷ একটি সবে ওড়ার জন্য পাখনা মেলেছে৷ পাঁচহাজার বছরের পুরোনো তুলিতে সে কি গতি, রঙের কি দীপ্তি! আলতামিরার বাইসন কোনদিন দেখতে পাবো কিনা জানি না৷ কিন্তু এই পাখির ছবি দেখে মনে হল আগন্তুকে উত্পল দত্তের মুখ দিয়ে সত্যজিত্ যা বলিয়েছিলেন তা একদম ঠিক৷ এমন আঁকতে না পারলে আঁকা শেখার কোন মানেই হয় না৷ দেখলাম সেই স্ক্রাইবের মুর্তি৷ রাজসভায় যা কথা হচ্ছে সব সে লিখে নিচ্ছে৷ চোখদুটি ফারাওএর দিকে নিবদ্ধ৷ নির্নিমেষ সেই দৃষ্টি কি অসম্ভব জীবন্ত! ভিভিয়ান তার হাতের তর্চ ফেললো স্ক্রাইবের দুই চোখের মণির ওপর৷ শিউরে উঠলাম৷ এক পুরোহিতের মুর্তি দেখলাম৷ তার চুল এবং গোঁফ দুইই আছে৷ মিশরীয় পুরোহিত মাত্রেই ক্লিনশেভড - এই ধারনাটা ভুল প্রমান হল৷ শেষ কুড়ি মিনিট ভিভিয়ান আমাদের দিয়েছিল নিজেদের মত ঘুরে দেখার জন্য৷ অতো বড়ো মিউজিয়ামে কুড়ি মিনিটে আর কি হবে৷ এলোপাথারী ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষন এবং ভিভিয়ান ছাড়া যে আমরা একেবারেই অচল সেটা অনুভব করলাম বেশ ভালো ভাবেই৷ কায়রো মিউজিয়ামের কালেকশন প্রচুর হলেও ডকুমেনটেশন বিশেষ ভালো নয়৷ আমরা একটা সার্কোফেগাসের ঘরে ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষন৷ ফিফটি পার্সেন্ট সার্কোফেগাস জাস্ট এমনি পড়ে আছে৷ কার সার্কোফেগাস, কোথায় পাওয়া গেছিল, যে ছবি আঁকা আছে তার অর্থ কি - এসব কিচ্ছু লেখা নেই৷ একটা কালো পাথরের স্ল্যাব দেখলাম৷ তার গায়ে এক নগ্ন শিশুর ছবি আঁকা৷ এতোদিন যা মিশরীয় আর্ট দেখেছি এ তার চেয়ে একেবারে আলাদা৷ কিন্তু কিচ্ছু লেখা নেই৷ ওটা যে কি তা আর জানা হবে না কোনদিনও৷

নটে গাছটি মুড়োনোর সময় এগিয়ে আসছে৷ মিশর থেকে ফেরার সময় যেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল, মনে হচ্ছিল এতো দিন একটা মিশন ছিল লাইফে - সেটা শেষ হয়ে গেল - এই ডায়েরীর শেষে এসেও মনে হচ্ছে আমার ছোটোবেলার রূপকথার অধ্যায় সত্যিই শেষ হল৷ এর পর এটা শুধুই একটা স্মৃতি হয়ে যাবে৷ শেষ সন্ধ্যায় আমাদের জন্য একটা গালা ডিনারের ব্যবস্থা ছিল নীলনদের ওপরে৷ ভাসমান রেস্টোরান্টে খাওয়াদাওয়া৷ তার সাথে বেলি ড্যান্সের আসর৷ খাওয়টা ছিল পুরোপুরি অ্যামেরিকান স্টাইলে৷ আমাদের বিশেষ ভালো লাগে নি৷ তবে বেলি ড্যান্স খুব ভালো লাগলো৷ আরো ভালো লাগলো বেলি ড্যান্স শুরু হওয়ার আগে একটি ছেলের নাচ৷ নাচটার নাম কিছুতেই মনে পড়ছে না৷ ছেলেটি এক হাজার বার পাক খেলো৷ অ্যারাবিক মিউজিকের আবহে হাজারপাকের নাচ অসাধারন লাগছিল৷ তবে মনে হচ্ছিল এই নাচ এই সুসজ্জিত বিলাসবহুল প্রমোদতরনীতে বেমানান৷ এই নাচ হওয়া উচিত ছিল দিগন্ত বিস্তৃত সাহারার বুকে আগুন জ্বালিয়ে৷

পরের দিন সকাল দশটায় ছিল ফ্লাইট৷ কায়রো এয়ারপোর্টের মত বিশৃঙ্খল এয়ারপোর্ট আমি আর একটাও দেখি নি৷ আমরা টার্মিনালে পৌঁছে গেছিলাম সকাল সাতটার মধ্যে৷ অজস্র বোঁচকা-বুঁচকি ঠেলে তিনবার সিকিউরিটি চেক-ইনের মধ্য দিয়ে যখন গেটে পৌঁছোলাম তখন বাজে সাড়ে নটা৷ মাঝখানে কি হল তা জানার জন্য মুজতবা আলি পড়ে নিন৷ কাবুলের রাস্তা আর কায়রো এয়ারপোর্টে বিশেষ তফাত্ নেই৷ এবং এতো কিছুর পরেও আমার ক্যারি অন লাগেজে এক বোতল জল ছিল, সেটা আমার ব্যাগেই রয়ে গেল৷ ফেরার প্লেনে চেপে বসলাম৷ রুক্ষ বালির শহর ভুমধ্যসাগরের নীলে মিশলো৷ তারপর আর কিছু দেখা গেলনা৷


(এই লেখার শুরুতেই যাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে চাই তিনি হলেন শুভাঙ্কুরদা - আমাদের সুপর্ণাদির জীবনসঙ্গী। ইউনিকোডে লেখার ব্যাপারে শত ব্যস্ততার মাঝেও দাদা আমাকে ভীষন সাহায্য করেছেন। উনি না থাকলে এই লেখা বাংলা হরফে এখানে প্রকাশ করা হয়ত সম্ভব হত না।)