About Me

I am like a pebble lying beside the road for ages. I observe and think. Sometimes I want things to be changed. But I am not an active person at all. So I just lie down and watch the play taking place around me. Somehow I enjoy the solitude I live in. I am happy with the package I came with. This beautiful earth, sunshine and rain…

Monday, September 20, 2021

মধুবাতা ঋতয়তে

 আমি ছোটবেলায় দিদার বাড়ি থাকতে খুব ভালোবাসতাম। যে সময়কার কথা আমার স্মৃতিতে ধরা নেই, সেই সময়ে আমায় জোর করে বাড়ি নিয়ে আসলে খানিক পরে ফেরত দিয়ে যেতে হত। দিদার হাতে আমায় দিয়ে বাবা করুণ মুখে বলত - খুব কাঁদছে। দিদার বাড়ির দিনগুলো আরোই স্বর্গপুরীর মত হয়ে উঠত যখন মাঝে মাঝে একজন লম্বা একহারা চেহারার সাদা শাড়ি পরা মহিলা কিছুদিনের জন্য এসে থাকতেন। ইনি আমার মায়ের পিসিমনি। আমার পিসিদিদু। মায়ের বাবাকে আমি কচ বলে ডাকতাম। পিসিদিদু আমায় ডাকতেন কচদিদু। পিসিদিদুর কোলের কাছটা কেমন পুরনো বাড়ির লাল মেঝের মত ঠান্ডা ছিল। আমি অবাক হয়ে দেখতাম এমব্রয়ডারী ফ্রেমের ভিতর কেমন নানা রঙের সুতোয় ফুল পাতার নকশা তুলছে পিসিদিদু। এই জিনিসটা আমার কাছে এক মুগ্ধতার বস্তু ছিল। মা, দিদা কেউই সেলাই করত না। ঠাকুমা খুব ভালো আসন বুনতো, কিন্তু কাঠের ফ্রেমে কাপড় আটকে অভিজাত ফোঁড় তুলতে আমি পিসিদিদু ছাড়া আর কাউকে তখনও দেখিনি।


আমার যবে থেকে মনে আছে তার আগেই পিসিদিদুর জীবন রংহীন হয়ে গেছে। খুবই নিষ্ঠার সাথে সমস্ত আচার পালন করতেন। দূর থেকে গল্প শুনলে হয়ত কৃচ্ছসাধন মনে হবে, কিন্তু তিনি এমনই আনন্দের প্রতিমূর্তি হয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে আচার পালন করতেন যে তাঁকে করুণা করার স্পর্ধা কারোর হবে না। আমি বিশেষ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়ি যখন জানতে পারি আমার বাবা-মায়ের অসবর্ণ বিবাহ পরিবারের মধ্যে অল্প যে কয়জন সাদরে মেনে নিয়েছিলেন তাঁদের একজন ছিলেন পিসিদিদু। যিনি নিজে অত্যন্ত আচারনিষ্ঠ ছিলেন তাঁর এই উদারতা আমায় অভিভূত করে। বুঝতে পারি, তাঁর আচারনিষ্ঠা গোঁড়ামী ছিল না। এই আচরণ প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও বিরল মনে হয়। জাতিভেদ সংক্রান্ত নিয়মকানুন হয়ত সময়ের সাথে শিথিল হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনও হামেশাই দেখতে পাই প্রথিতযশা অধ্যাপক, বিজ্ঞানীরাও নিজেরা যে মতটিতে বিশ্বাসী তার বাইরে কিছু দেখতে চান না। পিসিদিদু নিজে আচারনিষ্ঠ হয়েও নিয়মের শিকল যেখানে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে মেরে ফেলছে সেখানে শুকনো নিয়মকানুনের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

মিঠুনকে বিয়ে করার সময় আমার মা-বাবা উভয় পক্ষের দাদু-দিদাই গত হয়েছেন। আমাদের অশেষ ভাগ্য পিসিদিদু, তাঁর পরের ভাই ছোট দাদু এবং ছোট দিদা আমাদের আশীর্বাদ করে গেছেন। ছোট দাদু এক বর্ণময় চরিত্র। আমার মনে হত উনি সব সময় ছোটেন, তাই ওনার নাম ছোটদাদু। তাঁকে নিয়ে লিখতে হবে পরে কখনও। আমাদের বিয়ের পর দিল্লিতে একটি কাজে গিয়ে পিসিদিদুর সাথে দেখা করেছিলাম। রূপোর কয়েন দিয়ে নাতজামাইয়ের মুখ দেখলেন। শীর্ণ শরীর তখন শীর্ণতর ও জীর্ণ হয়েছে। প্রাণখোলা হাসিটি অটুট ছিল। তখন এবং আজও ভেবে অবাক হই - শোক তাঁর আত্মাকে তিক্ত করতে পারেনি। কখনও কোনও অভিযোগ করেছেন বলে শুনিনি মায়ের কাছে। আমাকে তো শুধু আদরই দিয়েছেন। সেবারে পিসিদিদুর ছেলে পাপ্পুমামাকেও দেখেছিলাম। তাঁর সাথে অল্প আলাপেই বোঝা যায় মানুষটি মোটেই সংসারী নন। আমরা ফিরে আসার আগে তিনি মিঠুনকে একটি টাই উপহার দিলেন। সংসার উদাসীন একজন মানুষ নিজে নিজে ভেবে এই কাজটি করলেন এটা আমার মনে থেকে গেছে। পরে আরও একবার দিল্লি যাই এবং একা যাচ্ছি জেনে পিসিদিদু জোর করেন তাঁর কাছে থাকতে। সেটাই শেষ দেখা ছিল। সেদিন ওনার জ্বর এসেছিল। নিষ্ঠাবতী পিসিদিদু পাপ্পুমামাকে রান্নাঘরের গ্যাসে রান্না করে দিতেন। নিজের খাবার বানাতেন ঘরের মধ্যে স্টোভে। আমি গিয়ে দেখলাম পাপ্পুমামা দুধ জ্বাল দিয়েছেন। স্টোভে পাঁউরুটি সেঁকার চেষ্টা করছেন। আমি বললাম - তুমি যাও, আমি করি। ভালোমানুষ পাপ্পুমামাও ছেড়ে দিলেন। মনে আছে, বোধহয় চিমটে খুঁজে না পেয়ে খালি হাতেই পাঁউরুটি এপিঠ ওপিঠ করছিলাম। পাপ্পুমামা বারবার বলছিলেন - তিতুম, বি কেয়ারফুল, হাত পুড়ে যাবে। পাপ্পুমামাকেও আর দেখিনি। দেখবও না। না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

আমার আনন্দস্বরূপা সন্ন্যাসিনীসমা পিসিদিদু শ্রীমতী তৃপ্তি ভট্টাচার্য গত নয়ই সেপ্টেম্বর তাঁর জীর্ণদেহখানি ত্যাগ করলেন। যাওয়ার সময়েও কারোর কোনো অসুবিধার কারণ ঘটালেন না। ছোটদাদু, ছোটদিদা আগেই চলে গেছিলেন। পিসিদিদুর সাথে ভট্টাচার্য পরিবারের একটি প্রজন্মের অবসান হল। গতকাল পারলৌকিক কাজ উপলক্ষে তাঁর ভাইপো-ভাইঝিরা এবং তাঁদের পরিবার একত্রিত হয়ে এই অসামান্য মানুষটির অনন্যসাধারণ জীবনকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিলেন।

দিল্লিতে তোলা ছবিখানি খুঁজে পাচ্ছি না। এজন্যই ফেসবুকের এলবামে তুলে রাখি যেখানে যা পাই। হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে কোনোদিন কোনো হার্ডড্রাইভে, হয়ত বৃথা আশা, কালের গর্ভে চিরতরে তলিয়ে গেছে। ততদিন মধু হোক পৃথিবীর ধুলি, মধু হোক বাতাস, নদ ও নদীতে মধুক্ষরণ হোক - মধুবাতা ঋতয়তে, মধুক্ষরন্তি সিন্ধব। যে সুহাসিনী মানুষটি ছিয়াশি বছরের নশ্বর জীবন থেকে সবে মুক্তি পেলেন, মধুময় পৃথিবীতে তিনি মিশে থাকুন। 

Sunday, August 1, 2021

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ

 বেড়াতে যেতে আমার এত ভালো লাগে তার একটা কারণ হল কোথাও গিয়ে একটু চোখকান খোলা রাখলেই এমন মজার সব জিনিস দেখা যায় যেগুলো জ্ঞানী লোকেরা জানলেও আমার মত সাধারণ পড়াশোনা না করা মানুষের পক্ষে নাগাল পাওয়া কঠিন। তেমনটাই হল পোর্তোরিকো এসে। স্বেচ্ছায় মানুষ অনেক কিছুই করে, কিন্তু বাইরে থেকে সেই জিনিসটাই চাপিয়ে দিলে মন বিদ্রোহ করে। এক বছরের ওপর বাড়ি না গিয়ে আগেও থেকেছি। এবারে যেহেতু কোভিডের চক্করে আর আমেরিকান গভর্নমেন্টের নির্দেশে আসা-যাওয়ায় বাধা পড়েছে, তাই কোনোমতেই ঘরে আর মন টিকছে না। পোর্তোরিকোয় এসে প্রথমেই চোখে পড়ল পথঘাট, পাহাড় কৃষ্ণচূড়ায় লাল হয়ে রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই চেনা রং মনের ক্লান্তি ঘুচিয়েছে। এদেশে এই গাছের নাম ফ্ল্যামবয়েন। লাল, হলুদ দুই রঙেরই হয়। আজ এক স্যুভেনির শপে ঢুকেছিলাম। উদ্দেশ্য ফ্ল্যামবয়েনের ছবি কেনা। মিঠুন এই ছবিটা হাতে ধরিয়ে দিল। রাঙা কৃষ্ণচূড়া তো রয়েছে, এই তিনজন মানুষ কারা? দোকানের মালিক বললেন এরা হলেন থ্রি কিংস। জানুয়ারীর ছ'তারিখে এই তিনরাজার উৎসব পালন হয়। পাঁচ তারিখে রাতে বাচ্চারা তিনরাজার জন্য খাবার আর জল রেখে দেয়। ছ'তারিখ সকালে উঠে তারা দেখে রাজারা সেসব খেয়ে তাদের জন্য উপহার রেখে গেছেন। গল্পটা সান্তাক্লজের মত। তবে কি এখানে ক্রিসমাস হয় অর্থোডক্স মতে জানুয়ারী সাতে? যেমনটা হয় গ্রীসে, রাশিয়ায়, প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলোতে? তা-ও নয়। ক্রিসমাস পঁচিশে ডিসেম্বরই হয়, তবে সেদিন উপহার আদান-প্রদান হয় না। হোটেলে এসে সামান্য খুঁজতেই বেরিয়ে গেল এই তিন রাজা আসলে সেই তিন জ্ঞানী মানুষ। মাধ্যমিক আমরা গিফট অফ দ্য ম্যাজাই গল্প পড়েছি। সেই তিন ম্যাজাই। যীশুর জন্মের সময় যাঁরা উপহার নিয়ে এসেছিলেন। পোর্তোরিকো দেশটা বারো মাসে তেরো পার্বনের। তারা সমুদয় আমেরিকার সাথে তাল রেখে পঁচিশে ডিসেম্বরের ক্রিসমাস নিয়েছে, আবার সাতই জানুয়ারীর অর্থোডক্স ক্রিসমাসও কোনোভাবে লৌকিক স্মৃতিতে ঢুকে পড়েছে। এদিকে বরফের দেশের সান্তাক্লজের গল্পটাও এমন ভালোবেসে ফেলেছে যে তার সাথে তিন ম্যাজাই মিলেমিশে একাক্কার। এইসব করতে গিয়ে এদের খেয়ালই নেই জানুয়ারীর ছ'তারিখে ম্যাজাইরা উপহার আনলে, ডিসেম্বরের পঁচিশে যীশুর জন্মদিন উদযাপনে লজিকের একটা বড়সড় গন্ডোগোল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে কি! এভাবেই তো যুগে যুগে দেশে দেশে লোক সংস্কৃতির জন্ম হয়। শেষ যেবার বাড়ি যেতে পেরেছিলাম অজন্তা ঘুরতে গেছিলাম। সেখানে দেখেছি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বুদ্ধের গুহাচিত্র। কেমন ভালোবাসলে ঈশ্বরের ছবি নিজের গায়ের রঙে আঁকা যায় সে কি আর আমি বুঝব! এই ছবিতেও যেমন দেখা যায় তিন জ্ঞানী মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন থোকা থোকা লাল ফুলে ভরা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। বাস্তবের বেথলেহেমে এ গাছ তো কখনো জন্মায়নি। এর স্থান শুধু শিল্পীর মনোজগতে। যুক্তি আর তথ্যের ভার সরিয়ে সুন্দরের উপাসনা তার কাজ। সুন্দরকে সৃষ্টি করতে না পারলেও, মাঝেমধ্যে তাকে চিনতে পারি। মন তখন ভারী খুশি হয়ে ওঠে। পথে বেরোনো সার্থক হয়।



Tuesday, June 22, 2021

ক্যাম্পিং

 মাস ছয়েক ধরে একজন ঘ্যানঘ্যান করে চলছে - আমরা কলোরাডো থাকতে থাকতে একবার এসো। কখনো হুমকি দিচ্ছে - আমরাই শুধু যাই, তোমরা আসো না, এবার না এলে আমরাও আর যাবো না। তারপর তো মেসা ভার্দে আর টেলুরাইডে ক্যাম্পসাইট বুক করে ফেলে ঘোষণা করল - আমাদের সাথে না গেলে তোমরা তো কখনো ক্যাম্পিং করবে না, আসতেই হবে তোমাদের। রোজ কানের পোকা নাড়াতে থাকলে কাঁহাতক আর প্রতিরোধ করা যায়! অতএব টিকিট কাটা হল। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে রাত কাটানোর দুশ্চিন্তায় প্রথমে মাড়ি ফুলে গেল, তারপর কোমরে ব্যাথা এবং সেটা চুকতে না চুকতে বগলে ফোঁড়া। হ্যাঁ জানি, শেষেরটি ভদ্রমহিলাদের হওয়া উচিত না। তবু সত্যের পথ বন্ধুর। সবশেষে চেরি অন দ্য কেক যাত্রার দিনে পা মচকানো। ততদিনে আমারও জেদ চেপেছে ক্যাম্পিং না করলেই নয়। বৃহস্পতিবার রাতে কলোরাডো পৌঁছে অভি-পুবালির সিগনেচার ল্যাম্ব বিরিয়ানি দিয়ে ডিনার হল। পরের দিন বিকেলে দুখানা তাঁবু, চারটে স্লিপিং ব্যাগ, এয়ার বেড, খাবারদাবার দিয়ে গাড়ি ভরে বেরোনো। বোল্ডার থেকে মেসা ভার্দে সাড়ে সাতঘন্টা। সেদিন ঘন্টা পাঁচেক গিয়ে একটা মোটেলে রাত্রিবাস করে পরের দিন বাকি পথ যাওয়া হবে। মেসা ভার্দে সত্যি বলতে ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে বেশ নিরেস। সাতশো থেকে বারোশো সালের মধ্যে এখানে নেটিভ ইন্ডিয়ানদের একটি বসতি ছিল। সেই সব ঘরবাড়ির কিছু নিদর্শন আছে। খুব অল্প লোক নিয়ে দিনে দুটি রেঞ্জার অপারেটেড ট্যুর হয়। এই ট্যুরে বসতিগুলোর ভিতরে ঢুকে দেখা যায়। দুসপ্তাহ আগে সকাল আটটায় টিকিট রিলিজ হয়। পুবালি আটটা দশে লগিন করে দেখে সব টিকিট শেষ। আমাদের ভাগ্যে তাই মূলত দূর থেকে দেখা, আর কয়েকটি সাইটে ভিতরে ঢোকার সুযোগ। সাঁইত্রিশ ডিগ্রি গরমে সেই অভিজ্ঞতা খুব সুখকর হচ্ছিল না। নাভাহো ইন্ডিয়ানরা নাকি বারোশো সালে খরার চোটে এই চত্ত্বর ছেড়ে পালায়। ওদের মত কষ্টসহিষ্ণু জাতই পারলো না, আমরা তো তুচ্ছ বাঙালি - এই ভেবে নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। পাঁচটা নাগাদ সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হল আর পারা যাচ্ছে না, এবার ক্যাম্পসাইটে গিয়ে জিরোনো যাক। ন্যাশনাল পার্কের লগক্যাবিনে আমরা বহুবার থেকেছি। কিন্তু ক্যাম্পিং এই প্রথম। পুবালি জোর না করলে কোনোদিনই করতাম না। বাথরুম নিয়ে খুব ভয় ছিল এমন না। এখানে তো এমনকি চানের বন্দোবস্তও আছে। মূল সমস্যা ঘুমের। আমি এবং মিঠুন্দা দুজনেই বহু আরাধনা করে কদাচিত নির্বিঘ্ন ঘুমের আশীর্বাদ পাই।মূলত এই কারণেই ক্যাম্পিংএ রাজি হতে ভয় ছিল। অভি-পুবালি ক্যাম্প অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র নিয়ে চলল ক্যাম্পসাইট বাছতে। আমাদের দুখানি তাঁবু পড়বে। গাছগাছালি ঘেরা নিরিবিলি একটুকরো জমি বেছে নিয়ে নিমেষের মধ্যে দুই ওস্তাদ তাঁবু খাটিয়ে ফেলল। অভি একছড়া সোলার টুনিবালব কিনে রেখেছিল। তাদেরও ঝুলিয়ে দেওয়া হল গাছের ডালে। আমরা দুইজন এদের জেনারেশন কত স্মার্ট, কত এফিসিয়েন্ট এসব আলোচনা করতে করতে চানে গেলাম। মেইন ক্যাম্প অফিসের কাছে শেয়ারড চানের জায়গা। গাড়ি নিয়ে যেতে হল। টয়লেট অবশ্য ক্যাম্প সাইটেই আছে অনেকগুলো। অল্প দূরে দূরেই। বেশি হাঁটতে হবে না। চান সেরে ফিরে দেখি ওরা নিজেদের তাঁবুও খাটিয়ে ফেলেছে। আমাদের জন্য গাছের ছায়ায় বড় তাঁবু। নিজেরা খোলা আকাশের নিচে ছোট তাঁবু নিয়েছে। আমরা কিনা ওদের তত্ত্বাবধানে গেছি। তাই এসব সর্দারি বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলাম। এবার আগুন জ্বালিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা। স্যামন মাছ, পাতলা করে কাটা গরুর মাংস আর আনারস নিয়ে গেছিলাম পোড়ানোর জন্য। অলিভ অয়েল আর গার্লিক সল্টে ভেজানো মাছ-মাংস সেঁকে নেওয়া হল আগুনের আঁচে। তারপর লেবু ছড়িয়ে হুস হাস খাওয়া। শেষপাতে আমাদের অভিভাবকেরা মিষ্টি মার্শমেলো

পুড়িয়ে দিল। মুখে দিলে গলে যায় আহারে কি সৃষ্টি! খাওয়া দাওয়ার পাট তুলে সবে মাদুর বিছিয়ে বসা হয়েছে টপটপ করে বড় বড় ফোঁটায় বর্ষণ শুরু হল। আমাদের জন্য খাটানো বড় তাঁবুটায় চারজনে ঢুকে পড়লাম। এই প্রথম ক্যাম্পিং, তাই মুগ্ধ হয়ে দেখলাম বাইরের ধুলো-বালি, পোকামাকড়, বৃষ্টি - কিছুই তাঁবুর ভিতরে ঢোকে না। এমনকি আমাদের বড় তাঁবুটাতে ছাউনিসহ নেট লাগানো জানলাও আছে। সেই জানলা খুলে দিতেই ভিজে হাওয়া ঢুকে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিল। হাহাহিহি করে কেটে গেল বেশ অনেকটা সময়। ইতিমধ্যে এক বিপত্তি। টয়লেট থেকে ফেরার পথে পায়ে খোঁচা খেয়ে পুবালির কড়ে আঙুল জখম। অভি ঝটিতি ফার্স্ট এইড বক্স এনে ক্ষত মেরামত করল। আরও কিছু রাত এগোলে ঠিক হল ঘুমের চেষ্টা করা যাক। আমরা দুজনেই জানি চেষ্টা যতই করা হোক, তিনি ধরা দেবেন না। অভি-পুবালি ব্যবস্থার ত্রুটি রাখেনি। এয়ার বেড বিছিয়ে দিয়েছে। যে যার স্লিপিং ব্যাগে নিজেদের মুড়ে শুতে গিয়ে দেখি মিঠুন্দা বিছানাসহ ডুবে গেলেন, আর আমি মাস্তুলে বসা ফিঙে পাখিটির মত ভেসে রইলাম। পুলকিত হয়ে খোঁজ নিলাম ইদানিং মিঠুন্দার ওজন কেমন যাচ্ছে। আমি কি এতটাই হাল্কা! জানা গেল দৈর্ঘের মত ভারেও এখনো মিঠুন্দাই এগিয়ে। উনি অবশ্য বললেন ওজনটা কারণ নয়, তাঁবু ঢালু জমিতে খাটানো হয়েছে বলেই আমার এমন ফিঙে বিভ্রম। প্রস্তাব দিলাম - পরীক্ষা করেই দেখা যাক। স্থান পরিবর্তন হল। অধ্যাপকের পর্যবেক্ষণ মিথ্যে নয়। এবার মিঠুন্দা ফিঙে, আমি জগদ্দল পাথর। তিনি মাস্তুল আঁকড়ে পড়ে রইলেন। আমিও ঢালের বিপরীত মুখে নিজেকে আটকে রাখার চেষ্টা করলাম প্রাণপণ। একটু চোখ লেগে এসেছিল। স্বপ্ন দেখছিলাম আমার মাস্টার্স স্টুডেন্ট বলছে - আমি তো ফাইল সেভ করতে জানি না, আমি মুখে মুখে বলে যাচ্ছি, তুমি কি কোডটা লিখে নেবে? আতঙ্কে ঘুম ভেঙে দেখি মিঠুন্দা জ্যাকেট পরে বসে আছেন। বললেন টয়লেট যাবেন। আমিও সাথে যাবো বলে বেরোলাম। দেখি সারাদিনের মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ তারায় ঝলমল করছে। চাঁদ ডুবে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে বয়ে চলেছে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। আমরা দুটিতে কথা হারিয়ে আমাদের ক্লান্ত চোখে সেই রূপসুধা মেখে নিলাম। ঠিক করলাম বাকি রাতটুকু বাইরে বসেই কাটিয়ে দেব। আমাদের নড়াচড়ায় অভি-পুবালিরও ঘুম ভেঙে গেছে। ওরাও বেরিয়ে এল। আকাশ পরিস্কার না থাকার জন্য সারাদিন ধরেই মন খারাপ ছিল। শেষরাতে এমন সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে কে আর জানতো! কিছুক্ষণ গল্প করে আবার ঘুমের চেষ্টা করা হবে ঠিক হল। এবার ভাবলাম এয়ার বেডের হাওয়া বার করে দিয়ে দেখা যাক। খুব একটা উপকার হল না। মিঠুন্দা গাড়িতে শুতে গেলেন। আমি ভুমিশয্যায় এপাশ ওপাশ করে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম। নিজস্ব ঘর, এটাচড টয়লেট - এসব যে প্রিভিলেজ তা দিব্যি বুঝি। ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ করাও যে প্রিভিলেজ, তার জন্য যে পুরু গদি লাগে তা ভুলে ছিলাম অনেকদিন। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না যদিও। পনেরো বছর বয়েসে যে তোষক নিয়ে প্রথম হোস্টেলে ঢুকি, যা আমি ব্যবহার করেছি বাইশ পর্যন্ত এবং আমার পরে আমার ভাই - তার পুরুত্ব অভি-পুবালির দেওয়া স্লিপিং ব্যাগের চেয়ে বেশি ছিল না। এমনকি বিদেশে ছাত্রাবস্থাতেও অফিসে স্লিপিং ব্যাগ পেতে রাত্রিবাসে বাধ্য হয়েছি। সেও সুদূর অতীতের কথা নয়। কিন্তু কে না জানে আরামে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে না। অতএব আমার গেছে যে দিন তা একেবারেই গেছে। খোলা আকাশের নিচে নিশ্চিন্ত ঘুম বিদায় নিয়েছে জীবন থেকে। আমাদের তরুণ দুজন সাথী - এখনও জং ধরেনি ওদের পায়ে, এখনও ওরা ফুসফুসে ভরে নিতে পারে তাজা হাওয়া - ওদের মুগ্ধ হয়ে দেখি। পাখিডাকা ভোরে উঠে পড়েছে ওরা। তাঁবু গুছিয়ে গাড়ি ছুটবে পরের গন্তব্যের পথে।

Saturday, July 11, 2020

আয়া সোফিয়া

 আয়া সোফিয়ার সামনে যতবার দাঁড়িয়েছি একটা কৃতজ্ঞতা বোধ হয়েছে। কারণটা ব্যাখ্যা করি। ইস্তাম্বুল বা কনস্ট্যান্টিনোপল শহর যতদিন পৃথিবীতে আছে, আয়া সোফিয়াও প্রায় ততদিন। মনে করা হয় কনস্ট্যানটাইন খ্রীষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার আগে এখানে মন্দির ছিল যেখানে মূর্তিপুজো হত। কনস্ট্যানটাইন দক্ষ রাজনীতিক ছিলেন। খ্রিস্টান এবং মূর্তিপূজক দুইপক্ষকেই খুশি রেখে চলতেন। তবে মারা যাওয়ার আগে নিজে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে মূর্তিপুজো লোপ পেল। গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ হিসেবে আয়া সোফিয়া তৈরি হল। দেখবার মতো স্থাপত্য। চার্চের ভিতরের দেওয়ালে অসাধারণ সব মোজাইকে যীশুর জীবনের নানা ঘটনা আঁকা। কনস্ট্যান্টিনোপলের ইতিহাস ঘটনাবহুল। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে আয়া সোফিয়ারও। একবার এক আইকনোক্লাস্ট পাগলা রাজা এসেছিল। তখন ইসলাম সবে জন্ম নিয়েছে। মুসলিমদের দেখাদেখি তার মনে হল ঈশ্বরের ছবি আঁকা পাপ। তখন তার নির্দেশে ঈশ্বরের পুত্রের সব ছবি মুছে দেওয়া হল আয়া সোফিয়া থেকে। সেই পাগলের যুগ শেষ হলে আবার পরের রাজা এসে ভালো ভালো মোজাইক করিয়ে দিলেন। এইভাবে চলে। চতুর্থ ক্রুসেডের সময় রোমান ক্যাথলিকদের সাথে গ্রীক অর্থোডক্সদের ঝগড়া বাধল। কনস্ট্যান্টিনোপলে ব্যাপক লুঠতরাজ চলল। কিছুদিনের জন্য গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ হল রোমান ক্যাথলিক। তবে রোম থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল শাসন করা সহজ ছিল না। বস্তুত সেই কারণেই কনস্ট্যান্টিনোপল শহর তৈরি হয় হাজার বছর আগে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য শুরু হয়েছিল ইস্টার্ন রোমান সাম্রাজ্য হিসেবে। পরে সুতো আলগা হয়ে যায়। এবারেও চতুর্থ ক্রুসেডের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই আয়া সোফিয়া আবার গ্রীক অর্থোডক্স হয়ে যায়। আরও দেড়শো বছর পর কনস্ট্যান্টিনোপলে বড়সড় পরিবর্তন আসে। অটোমান রাজারা শহর দখল করে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য চিরতরে শেষ হয়। আয়া সোফিয়া হয়ে যায় মসজিদ। শহরের নাম ইস্তাম্বুল।

১৯৩৫ সালে কামাল আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্কের ভার নেন। সহস্রাধিক বছরের হানাহানির সাক্ষী আয়া সোফিয়াকে তিনি মিউজিয়াম বানিয়ে দেন। সেই মিউজিয়ামে মুসলমান ও খ্রীষ্টান দুই ধর্মের স্মারকই জায়গা পায়।
২০১৪ সালে আমার প্রথম ইস্তাম্বুল যাওয়ার সুযোগ ঘটে। সেই সময় এই মিউজিয়ামটির ইতিহাস আমি জানি এবং আমার মনে হয় আয়া সোফিয়া নামের মর্যাদা এই মিউজিয়ামটি রাখতে পেরেছে। গ্রীক ভাষায় সোফিয়া শব্দের অর্থ প্রজ্ঞা। জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গচিহ্নের জন্য মানুষের প্রতি ঘৃণা ও বঞ্চনা তো প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে না। অথচ আয়া সোফিয়ার দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে এ জিনিস হয়েই চলেছে। কামাল পাশার কথা জেনে মনে হয়েছিল আগে যা হয়েছে সেসব পুরনো দিনের কথা বাক্সবন্দি করে রেখে দেওয়া যায়। নতুন পৃথিবী এমন হবে না। ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে যারা বিভেদ সৃষ্টি করে নতুন পৃথিবী তাদের বুজরুকি ধরে ফেলে হো হো করে হাসবে। মধ্যযুগের অন্ধকার যাদের মনে বাসা বেঁধে আছে তাদের মোজাইকের ধুলো ঝাড়া অথবা মিউজিয়ামের সামনের সবুজটুকুর পরিচর্যার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হবে। বাইজান্টাইন শিল্পীর আঁকা যীশুর করুণাঘন চোখ আর অটোমান ক্যালিগ্রাফিতে ঈশ্বরের নাম পাশাপাশি দেখে তাদের মনে হয় দুজনের প্রতিই প্রেম জন্মাবে অথবা ধর্মের খোলস ছাড়িয়ে তারা নিখাদ শিল্পটুকুকে ভালোবাসতে শিখবে। এইসব ভেবেই কৃতজ্ঞতা জেগেছিল কামাল পাশার প্রতি। এই মাস্টার স্ট্রোক ফেল করতেই পারে না - এমন ভেবেছিলাম। সামনের পৃথিবী পুরনো পৃথিবীকে গোহারান হারিয়ে দেবে এমন ভেবেছিলাম।
আজ বিশ্বাসভঙ্গ হল। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব এরদোগান ধর্মনিরপেক্ষ আয়া সোফিয়া মিউজিয়ামকে আবার মসজিদ করে দিলেন। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে অপরাধবোধ জাগছে। লজ্জা হচ্ছে। আর কি বলব!

Thursday, June 4, 2020

মিঠুন্দার মাস্কতুতো ভাই

 স্থানঃ বৈদ্যবাটির একটি পাড়ায় সবজিবিক্রেতার ঠেলাগাড়ি

কালঃ সকাল নয় ঘটিকা
পাত্রঃ ঠেলাগাড়ির সামনে জটলারত প্রতিবেশীদ্বয় - একজন অধমের জনক প্রদীপবাবুস্যার, অন্যজনের নাম ধরা যাক শ্যামল (কাল্পনিক)
প্রদীপবাবুস্যারঃ একি শ্যামল! তুমি মাস্ক পরো নি?
শ্যামলঃ না না স্যার, এখন তো বাজার করছি। মাস্কটা এখন পরি না।
প্রদীপবাবুস্যারঃ তাহলে কখন পরো?
শ্যামলঃ এই তো বাড়ি গিয়ে চান করে চা খাবো। তারপর মাস্ক পরে খবরের কাগজ নিয়ে বসবো।

Sunday, May 17, 2020

আরুগ্রামে

 আরু গ্রামের বিশ্রামাবাস থেকে সকাল বেলা হাঁটতে বেরিয়ে মনে হল সামনের সবুজ পাহাড়টায় চড়া যাক। সেবারে ফিরে এসে জেনেছিলাম রক্তের হিমোগ্লোবিন বিপদসীমার নিচে। তখন উপসর্গ বলতে চড়াই উঠতে দমের অভাব। মিঠুন যত্ন করে বিশ্রাম করিয়ে করিয়ে গল্প করতে করতে নিয়ে যায়। মে মাসের নবীন সতেজ উপত্যকা, বুনো ফুল, তিরতিরে নদী সবাই মিলে উতসাহ দেয়। খানিক পথ উঠে একটা ছোট গুহা। একটা ক্ষীনতোয়া প্রস্রবণের মুখ। সেখানে একটা পাথরের ওপর কাওয়ার সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে একটা লোক। সেখানেই ছেলেটার সাথে দেখা। এক পাল ভেড়া নিয়ে উপত্যকার নিচে বাসা বাঁধা বকরওয়ালদের গুষ্টি উদ্ধার করছিল চা-ওলার সাথে। আমি সুযোগ পেয়েই বসে পড়ি। মিঠুন গল্প জোড়ে। কাওয়া খেতে খেতে সেই বছর পনেরোর রাখালছেলের সাথে আলাপ। ছেলেটা তার মায়ের প্রথম সন্তান। রীতি অনুযায়ী নাম পেয়েছে মহম্মদ।এরা গুজ্জর। জম্মুর নিচের কোন গ্রাম থেকে শীতের শেষে ভেড়া নিয়ে বেরিয়েছে মা আর চার ভাইবোন নিয়ে। পাহাড়েই কাটবে গ্রীষ্মের মাসগুলো। চিকন সবুজ উপত্যকায় আগের বছরের ফেলে যাওয়া কাঠের ঘরের কাঠামো মেরামত করে পশুপালন চলবে। রোম্যান্টিক জীবন মনে হয় দূর থেকে। কাজাখ সহকর্মীর কথা মনে পড়ে। চীনের বর্ডারে থাকতো তারা। পশুপালন পেশা। গোটা গরমকালটা সবুজ সবুজ উপত্যকায় পশু চরায়। মধু সংগ্রহ করে। জীবনের প্রথম আঠেরো বছর কোনো ওষুধ কোম্পানির তৈরি গুলি খায় নি সে। কাওয়া খেয়ে এই ছেলেটার সাথে হাঁটতে থাকি। কথায় কথায় বলে ইসলামাবাদে গতকাল ঝামেলা হয়েছে। খট করে কানে বাজে। শ্রীনগরকে স্থানীয়রা ইসলামাবাদ বলে। তবে ট্যুরিস্টদের সামনে বলে না। এ ছেলের সে খেয়াল নেই। সিনেমায় অভিনয়ের খুব শখ। মিঠুন কিনা টালিগঞ্জের ছেলে। উত্তমকুমারের পরেই তার নাম। মহম্মদ মিঠুনকে বলে, তোমাদের ওখানে আমার কোনো সুযোগ হয় না? ইংরিজি জানি একটু একটু। তোমাদের ভাষাও শিখে নেবো। আমরা অতি কষ্টে সামলাই। - বকরওয়ালদের ওপর রাগ কেন ভাই? - ওরা নোংরা করে রাখে পাহাড়টা। লোক ভালো না ওরা। হিমালয়ের অবর্ণনীয় ঐশ্বর্যে শিহরিত আমরা জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। আমার বিশ্রামও হয়। মহম্মদ ছবি তোলা দেখে। - তুমি তুলবে? সলজ্জ ঘাড় নাড়ে সে। জুম, এক্সপোজার শিখে নেয় সঙ্গে সঙ্গেই। দেখতে দেখতে উপরের উপত্যকায় উঠে আসি। সবুজ মখমলে মোড়া সমতল। দুইখানা কাঠের ঘর। - তোমাদের ঘর নাকি? - না না, আমরা আরও ওপরে উঠে গেছি। এখন কেউ নেই এখানে। ঘরের সামনে একটা বড় পাথরের স্ল্যাব। যেন চেয়ার পাতা আছে উঠোনে। আমি পা ছড়িয়ে বসে হা হা করে নিশ্বাস নিই। আর উঠবো না। রাখাল ছেলে আমাদের ক'টা ছবি তুলে দিয়ে ভেড়ার দল নিয়ে আরও উপরে উঠতে থাকে।




আরুগ্রামে

 আরুগ্রামে আমরা ছিলাম বিলালভাইয়ের আতিথ্যে। রজত সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। পহেলগাম থেকে বারো কিমি দূরে ছোট্ট গ্রাম আরু। বিলালভাই এর গেস্টহাউস মিল্কি ওয়ের সামনেই বিস্তীর্ণ সবুজ উপত্যকা। ঘন পাইন বনের ওপাশে বরফে মোড়া পাহাড়চুড়ো। তিরতির করে বয়ে চলে আরু নদী। বিলাল ভাইয়ের দাদা ফৈয়জ ভাইকে মাইক্রফট হোমসের মত দেখতে। শার্লক হোমসের দাদাকে আমি দেখিনি, কিন্তু বর্ণনা পড়ে মনে হয় তিনি নিশ্চয়ই এমনই লম্বা, এমনই খাড়া নাক তাঁর, এমনই ক্ষুরধার দৃষ্টি। গেস্ট হাউসের কাঁচ ঢাকা বারান্দা থেকেই ইশকুলটা দেখা যায়। গ্রামের একমাত্র ইশকুল। ফৈয়জ ভাই বললেন টিফিনের ছুটির সময় মাস্টারমশাইয়ের সাথে দেখা করা যাবে। ইশকুলে সাকুল্যে চারজন শিক্ষক। দুইজন হিন্দি, উর্দু পড়ান। বাকি দুজন ইতিহাস, ভূগোল। বিজ্ঞান, অঙ্ক, ইংরিজি পড়ানোর কেউ নেই। ছেলেমেয়েরা কিন্তু দিব্যি বুদ্ধিমান। ছেলেরা মোটামুটি সকলেই লেখাপড়ার পাশাপাশি ট্যুরিস্ট সিজনে ঘোড়া ধরে। শুনে শুনেই চমৎকার ইংরিজি শিখে নিয়েছে। মাস্টারমশাই বললেন, কদিন আগে এক রিটায়ার্ড জেনারেল বেড়াতে এসেছেন। তাঁর ঘোড়া ধরেছে একটি বুদ্ধিদীপ্ত সপ্রতিভ ছেলে। জেনারেল রীতিমত অভিভূত হয়ে তার কথা জিগ্যেস করছেন গ্রামে। জানা গেল সে ছেলে পহেলগাম তফশিলে বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।

- ওরা কি আর পড়াশোনা করতে চায় না?
- বাবা-মায়ে ভয় পায় শহরের কলেজে পাঠাতে। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে যদি! ছেলেটাই যদি আর না থাকে!
আর মেয়েগুলো? ঘরের কাজ করছে। সেলাই করছে। দরদাম করে কাশ্মীরী হ্যান্ডলুম কিনে আনছে ট্যুরিস্ট। কলেজে যাচ্ছে কয়েকজন। গেলেই তো হল না। দুমদাম কার্ফিউ জারি হয়। পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। বছরের পর বছর নষ্ট হয়।
সন্ধ্যেবেলা ট্যুরিস্টদের প্রকোপ কমলে গেস্ট হাউসের সামনে উপত্যকায় ছেলেগুলো ক্রিকেট খেলে। আমি আর মিঠুন একপাশে দাঁড়িয়ে দেখি। মিঠুনের হাত-পা নিশপিশ করে। আমি বলি - তোর খেলতে ইচ্ছে হচ্ছে? সে হাসে - না না, দেখতেই ভালো লাগছে। একদিন বেলা প্রায় মরে এসেছে। এমন সময় একটা ট্যুরিস্ট বাস এসে দাঁড়ায়। সবাই নামেও না বাস থেকে। মহিলারা বিলাল ভাইয়ের পারিবারিক শালের দোকানে ঢুকে যান। পুরুষেরা সেলফি তোলেন। একজন ভদ্রলোক ইন্ডিজিনাস একটিভিটিতে অংশ নিতে এগিয়ে আসেন।
- তুমলোগ ক্রিকেট খেল রাহে হো? হাম ভি খেলেগা। ব্যাট দো মুঝে। দেখতে হ্যায় কওন মুঝে বোল্ড কর পায়েগা।
ছেলেগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ব্যাট দেয়। এক বলেই বোল্ড।
- ঠিক হ্যায়, অর এক বার।
আবার বোল্ড। তিন নম্বরটা ঠেকায়। তারপর আবার।
- হা হা! গুড জব। আচ্ছা লাগা তুমসে মিলকে। আচ্ছা, ইধার আও। এক ফটো লে লে? আচ্ছা, ওর এক ফটো। ব্যাট দো মুঝে। বহুত আচ্ছা!
এরপর ভদ্রলোকের খেয়াল হয় পাশেই উত্তরাধিকারী দাঁড়িয়ে। সুতরাং তাঁর ছেলেকেও ব্যাট করতে দিতে হয় যতক্ষণ না বাঁধিয়ে রাখার মত ছবি উঠছে। এইসব করতে করতে পাহাড়ে অন্ধকার হয়ে আসে। ছেলেগুলো খেলা গুটিয়ে ঘোড়া নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। ওদিকে মহিলাদের দোকান থেকে বার করতে হাঁকডাক শুরু হয়। আকাশছোঁয়া বরফচুড়োয় ঘেরা ওই বিস্তৃত উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমাদের দুই শহুরে মানুষের খুব লজ্জা লাগে। আমরা প্রাণপনে শতাব্দীপ্রাচীন মহাকারুণিক মানবাত্নার ক্ষমাভিক্ষা করতে থাকি।




Wednesday, April 8, 2020

শিভ্যলরি ইন দ্য টাইম অফ করোনা

 মাসখানেক একটানা রান্নাবাটি করে আজ অন্তরাত্মা বিদ্রোহ করলো। কিছুতেই রাঁধবো না। বার্গার কিং, ওয়েন্ডিস, এমনকি ম্যাকও চলবে। সাথের লোকটি এই সংকল্পে ঘাবড়ে গিয়ে সুড়সুড় করে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করল। আমি ঘরের পাজামাতেই একখানি মাস্ক সাথে নিয়ে তার পাশে গিয়ে বসলাম। ও হ্যাঁ, আমার চীনে বন্ধুর বাড়ি থেকে মাস্ক এসেছে, সে আবার তার সঞ্চয় থেকে আমায় পাঠিয়েছে কয়খান। হুঁ হুঁ বাবা, বন্ধু ভাগ্য নিয়ে কেউ কম্পিট করতে এসো না। রাস্তায় গাড়ি প্রায় নেই। নিরিবিলি শহর। ম্যাক বা বার্গার কিংএর দুর্ভাগ্য পোহাতে হল না। একখানি আর্বিস খোলা পাওয়া গেল। ড্রাইভ থ্রুতে খাবার নেবো। তাকে বললাম, পেমেন্ট করা আর অর্ডার ডেলিভারি নেওয়ার সময়ে মাস্ক পরিস, তাহলেই হবে। সে স্বাস্থ্য সচেতন। রিমোট অর্ডার প্লেসিংএর সময়েই মাস্ক পরে নিল। তারপর প্রতীক্ষা পেমেন্ট উইন্ডোর সামনে।

- উহ, মাস্কে কি গন্ধ রে! অনুপম বলছিল, এ জিনিস পরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না
- এখন খুলে রাখ না, পেমেন্ট নিতে এলে পরবি
- না না, পরেই থাকি
মিনিট দুয়েক বাদে জানলা খুলল। পুরনো ইংরিজি সিনেমাতে দেখেছি মহিলা দেখলে জেন্টলম্যানরা টুপি খুলে অভিবাদন জানান। আমার পাশের জেন্টেলম্যানটি অবিকল সেই ভঙ্গীতে মাস্কটি মুখ থেকে নামিয়ে পেমেন্ট সংগ্রাহক মহিলাটির দিকে "হাউ আর ইউ" ছুঁড়ে দিলেন।
- মিঠুন, মুখে চাপা
- হ্যাঁ হ্যাঁ
মুখ ঢাকলেও, নাক ঢাকতে বড়ই লজ্জা পেলেন জেন্টেলম্যানটি। পেমেন্ট চোকানো হল।
- হ্যাঁ রে, তুই গাড়ির মধ্যে মাস্ক পরে রইলি, আর লোকের সামনে এসে খুলে দিলি?
- কি করে যেন রিফ্লেক্সে হয়ে গেল। মনে হল মুখ ঢাকা থাকলে ও আমার কথা শুনতে পাবে না।
- আচ্ছা ঠিক আছে, খাবার নেওয়ার সময় মুখ ঢাকিস।
- এই তো, এখনই ঢেকে নিচ্ছি।
- এখন না করলেও চলবে। খাবার নেওয়ার সময় ভুলিস না।
মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা। খাবার নেওয়ার জানলায় মহিলাকে দেখা গেল আবার।
- মাস্ক পর, মাস্ক পর
পরলো সে তড়িঘড়ি। এবং আবার, ভদ্রা জানলা খোলা মাত্র, অভিবাদনের কায়দায় মুখোস খুলে,
- থ্যাংকস আ লট
- মিঠুন, মুখ
- ইয়েসস (মুখোস টানতে টানতে) হ্যাভ আ গুড নাইট
খাবার নিয়ে ড্রাইভ ওয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে,
- মিঠুন, তুই আবারও..
- এই তো, পরে নিয়েছি

Thursday, March 5, 2020

৮ই মার্চের গল্প

 ৮ই মার্চের গল্প (আজ সময় পেয়েছি, তাই আজকেই)

১৯৮৯র মে মাসে আমি চারুশীলা বসু বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেবছর আমার সাথে যারা ক্লাস ফাইভে বসতো তাদের সবার বয়েস এখন চল্লিশ। এদের মধ্যে দুইজন এবং আরও একজনকে নিয়ে আজকের গল্প।
আমি ছিলাম ফাইভের বি সেকশনে। পুজোর ছুটি পড়ার দিনে স্কুলের সব ক্লাসের সব সেকশনে কিছু না কিছু প্রোগ্রাম হত। নাচ, গান, নাটক - যা খুশি। সেবারে ছুটির পড়ার দিনেই শোনা যেতে লাগলো ফাইভের এ সেকশনের একটা মেয়ে ফাটিয়ে অভিনয় করেছে। এমন নাকি দেখা যায় না সহজে। সিক্সে সি সেকশনে জায়গা হল। কি সৌভাগ্য! সেই গুণের পাহাড় মেয়েটা সেবছর আমার সাথে একই সেকশনে। সেবারে আমাদের সিক্স সি-র ছোট্ট ঘরে টিচাররা, উঁচু ক্লাসের দিদিরা ভীড় করে পুজোর ছুটির প্রোগ্রাম দেখতে এলেন। তুষার কন্যা আর সাত বামনের গল্প নিয়ে নাটক হয়েছিল। হিংসুটে রাণীর চরিত্রে আবারও চমকে দিয়েছিল তিন্নি। '৯৫ সালে স্কুল ছাড়ি। ততদিন পর্যন্ত প্রতি বছরেই কালচারাল প্রোগ্রাম এই মেয়েটাকে ছাড়া ভাবা যেত না। '৯৫ এর পর ২০১৭। বাইশ বছরের ব্যবধানে আবার যোগাযোগ নিয়মিত হল। ততদিনে তিন্নি গিন্নী হয়েছে। একটা টুসটুসে অসোগোল্লাও এসে গেছে পৃথিবীতে। ২০১৮তে স্কুলের কয়েকজন বন্ধু একসাথে ছুটি কাটাতে গেলাম কলকাতার কাছেই এক টুকরো ছোট্ট সবুজে। তিন্নির থেকে জানলাম ওর কেকশপের স্বপ্নের কথা। তখনও স্বপ্নই। রান্না করতে ভালোবাসে। বাড়ির লোকজন, বন্ধুদের জন্য তো দুহাত ভরে করেই। শখটাকে যদি জীবিকায় রূপ দেওয়া যায়! আমি আর মিঠুন মিলে কেকশপের নামও ভেবে ফেললাম। তবে তখনও সবই ভাবনার স্তরে। কি ধাতুতে তৈরি এ মেয়ে কে জানে, চল্লিশে পা দিলে চালশে হওয়াই দস্তুর। কিন্তু তার বদলে চল্লিশটা জানলা যেন খুলে গেল। আত্মবিশ্বাস, কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবনীক্ষমতার ঝোড়ো হাওয়ায় যাবতীয় গড়িমসী গেল কেটে। দোকান বাড়ি এখনও আয়ত্বে আসেনি। কিন্তু বাড়িতে অর্ডার নেওয়া শুরু হয়ে গেল। আমাদের ব্যাচের ছেলেগুলোও সব সোনার টুকরো। এরা চিরাচরিত রীতিতে চল্লিশে পৌঁছে মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভোগে না। বরং জীবনসঙ্গিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তার স্বপ্নকে রূপ দিতে লেগে যায়। শ্বশুর-শাশুড়ির এনিভার্সারিতে তিন্নিকে কেক বানাতে বলেছিলাম। অফিস থেকে ফিরে সেই মধ্যমগ্রাম থেকে টালিগঞ্জে কেক দিয়ে গেল তিন্নির বর দেবাশীষ। এ বছর সে নিজের প্রোমোশন প্রত্যাখ্যান করেছে তিন্নির পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আর তিন্নিও অপরিসীম আগ্রহ আর সহজাত বুদ্ধিতে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। বাজারের কেনা ক্রিম ব্যবহার করে না। নিজে হাতে বানায়। সেই খাবারের স্বাদই আলাদা। নতুন নতুন জিনিস পরীক্ষা করতে গিয়ে ওর নিজস্ব ইনোভেশনের একটা বই তৈরি হচ্ছে ক্রমশ। সেইসব সিক্রেট রেসিপি এখানে লিখবো না। লোডশেডিংএর কল্যাণে ওভেন বন্ধ হয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কেমন একটা নতুন কেক তৈরি হয়ে গেছিল সেসব গল্প হয়ত ও নিজেই কোনো দিন করবে। শুধু এটুকু জানিয়ে যাই আমার মায়ের জন্মদিনে ব্লুবেরি চিজকেকের সাথে সেই দুর্ঘটনাজনিত আবিষ্কার বার্ণট বাটার কেকটা তিন্নি কম্পলিমেন্টারি আইটেম হিসেবে পাঠিয়েছিল। অমন জিনিস না ভারতে খেয়েছি (ভারতে অবশ্য স্বীকার করি অভিজ্ঞতা কম), না আমেরিকায়। অদ্ভুত মাদকতাময় বাটারের গন্ধযুক্ত খুব অল্প মিষ্টির সেই কেক হয়ত বা ইউরোপে পাওয়া যায়। কিন্তু সে তো বহু দূরের পথ।
চল্লিশে চাঞ্চল্য এসেছে বলছিলাম না? ঋতুপর্ণার কথা লিখি। ওর সাথে আমার কোনোদিন এক সেকশন হয় নি। স্কুলে থাকতে মুখ চিনতাম। ভাব ছিল না। ২০১৮য় বন্ধুদের সাথে বেড়াতে গিয়ে ঋতুর সাথে প্রথম সময় কাটালাম। ও-ই সব কিছু ব্যবস্থা করেছিল। টেন্ট বুক করা, কে কোথায় থাকবে, কে কি খাবে, কিভাবে যাওয়া-আসা হবে সমস্ত কিছু ঋতুর দায়িত্ব। আমরা গিয়ে আনন্দ করে এসেছি। তখনও ও পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। অফিসের চাকরির বাইরে ও যে অন্য কিছু ভাবছে সেটা জানার সুযোগ পাই নি। অতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। আর বয়েসটাও ছিল উনচল্লিশ। চল্লিশ ছোঁয়ামাত্র কি কি হল বলি। ঋতু খবর দিল চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই সাথে উত্তরপাড়ায় গঙ্গার ধারে একটা লাল টুকটুকে হেরিটেজ বাড়ির ছবি পাঠালো বন্ধুদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে। বাড়ির নাম বইThek। সেখানে কফি-স্যান্ডুইচ সহযোগে ঠেকবাজি তো হয়ই, সেই সাথে বইও দেখা যায় নেড়েচেড়ে। পছন্দ হলে পকেটস্থ থুড়ি ঝোলাস্থ করারও উপায় আছে। কফি খেতে বইThek এ গেলে একবার ভেতরের ঘরটাতেও উঁকি মেরে আসবেন। গদি বিছিয়ে, মোড়া পেতে সে এক বৈঠকী ব্যাপার। বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান বা বই সংক্রান্ত আলোচনার জন্য এই ঘরটা রাখা আছে। এবারে জানুয়ারি মাসে আমাদের বন্ধুদের আড্ডা জমেছিল এই স্বপ্নের মতো বাড়িটায়। সেদিন হেল্পিং হ্যান্ডদের সবাই উপস্থিত ছিলেন না। আমাদের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই ঋতু ক্ষিপ্র হাতে কাস্টমারদের জন্য ক্যাপুচিনো বানালো। বইএর ক্রেতাদের বিল কাটলো। শুনলাম আমাদের ব্যাচের আরেক সোনার টুকরো ছেলে ঋতুর বর সৌম্যও অফিস থেকে ফিরে বইThek এ ঋতুর হাতে হাতে কাজ সামলায়। এমনকি ওদের কলকলে ঝলমলে সাজুনি বুড়ি মেয়েও বিল কেটে সাহায্য করে।
আরেকজনের কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর কথা আমার আরও আগেই বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু এর জার্নি যখন শুরু হয় আমি তখন ছোট। চল্লিশের দোরগোড়ায় এসে জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতে কতখানি সাহস ও পরিশ্রম লাগে তা আমি সেদিন বুঝতাম না। সুপর্ণাদির কথা বলছি। এই দিদির সাথে যবে থেকে আলাপ হয়েছে অর্কুটে তখন থেকেই দেখি এর অসাধ্য কিছুই নেই। এমন কোনো হাতের কাজ নেই যা জানে না। যদি কিছু না জানা থেকে থাকে সেটাও শিখে নেয় দশ মিনিটে। তারপর সেই শেখাটাকে প্রোফেশনাল লেভেলে না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত থামতেই পারে না। এর চরিত্রে এই একটাই খুঁত। এ বড় পারফেকশনিস্ট। এখনকার মত ঘরে ঘরে বুটিকের ব্যবসা তখনো শুরু হয় নি। ২০১০ বা ১১ হবে। পেপার কুইলিং জুয়েলারি বানাতে শুরু করল। পুজোতে টুকটাক অর্ডার নিত। নিজের হাউসিংএর মধ্যেই। তারপর কুইলিং ছেড়ে কি জানি কি বিচিত্র উপায়ে দেখি কাগজ দিয়ে ঝুমকো দুল বানাচ্ছে, পেন্ডেন্ট বানাচ্ছে। দেখে মনে হয় জার্মান সিলভার বা পিতল। ঝুমকোর দৈর্ঘ্য দেখে ভয় হতে পারে কান ছিঁড়ে পরবে বুঝি। আসলে সব কাগজে বানানো। পালকের মতো হালকা। তার ওপরে কাগজ দিয়েই কুন্দনের নকশা। ভাবলাম মেটাল ফিনিশেই থামলো বুঝি। এনে ফেলল গ্লাস ফিনিশ। তার ওপর নিজের হাতেই এঁকে দিল মধুবনী নকশা। অন্য কেউ হলে ভাবতো যথেষ্ট হয়েছে। এগুলোই আবার করি। কিন্তু এর যাবতীয় তৃপ্তি নতুন কিছু শেখার মধ্যে। এবার শিখল বিডিং। সূক্ষ্ম সেসব নকশার নমুনা রইল কিছু। আজকাল পুজোর দুমাস আগে থেকে দেখি এর রাত জাগা শুরু হয়। আমি থাকি পৃথিবীর অন্য পিঠে। বিকেল বেলা হয়ত কখনো বলি, এখনো শুলে না? অন্যদিক থেকে উত্তর আসবে, এটা বানানোর পর বুঝলাম একটা ডিফেক্ট থেকে গেছে রে। আবার নতুন করে বানাচ্ছি। হলফ করে বলতে পারি, ঐ ডিফেক্ট আপনার আমার কারোর চোখে ধরা পড়ত না। কিন্তু এর যে স্বভাব খারাপ। পারফেকশনিস্ট!
চল্লিশে পৌঁছে অভ্যস্ত জীবনের নিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে নতুন কাজে ঝাঁপ দেওয়া একসময় অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল আমাদের দেশের মেয়েদের কাছে। দিন বদলাচ্ছে। বিশাল কিছু হয়ত নয়, নেহাৎ একটা ছোট পদক্ষেপ। অনেকখানি আত্মবিশ্বাস - আমি পারি, আমিও পারি।

Thursday, August 29, 2019

নামহীন

 মাছ খেতে যে আমি বাস্তবিকই ভালোবাসি সেটা বুঝেছিলাম দেশ ছাড়ার পর। বাড়িতে সব রকমের মাছ খাওয়া হলেও রোজকার মাছ বলতে রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি কার্প গোত্রের মাছই আসতো। আর দুর্ভাগ্য বশত এই মাছগুলো চল্লিশ বছর ধরে খেয়েও আমি ভালোবাসতে পারি নি। বর্ষাকালে মা বাজেট মানতো না। ইলিশ আসতো ঘনঘনই। পাবদা, ট্যাংরা, পার্শে ইত্যাদি মুখোরোচক স্বাদের ছোট মাছ হয় বাজারে নিয়মিত পাওয়া যেত না অথবা মধ্যবিত্ত পরিবারে রোজ কেনার ক্ষমতা ছিল না - কিছু একটা হবে। গুরজালি, আড়, বোয়াল, শোলের মত বড় মাছ বরং সেই তুলনায় বেশি আসতো। তা সত্বেও মাছের চেয়ে মাংসের দিকে ঝোঁক বেশি ছিল। এমন কি মুরগীর মাংসও ভালো লাগতো সে সময়। সাধে কি বলি, সে ছিল অন্য জন্ম!


তারপর এক সময় আমেরিকা চলে এলাম। আমেরিকার বাঙালীদের সাথে বাংলাদেশী দোকানে মাছ কেনাও অভ্যেস হল। লোটে, কাজলী, কাচকি এসব মাছ আমি সেই প্রথম দেখলাম। ফরিদপুরের উত্তরাধিকার যে রক্তে বহন করছি তার পরিচয়ও পেলাম যখন নিজে নিজেই কাচকি মাছের রেসিপি আবিষ্কার করে ফেললাম। প্রথম বার ইলিশের কালোজিরে কাঁচালঙ্কার ঝোল রেঁধে দেখলাম সর পড়ল না। তখন নিজেই বুদ্ধি করে বেগুন, কুমড়ো বা কচু দিয়ে রাঁধতে শুরু করলাম। সদ্য রাঁধুনির আনাড়িপনা ঢাকা পড়ে যায় এসব যোগ করলে।

প্রথম কিছুদিনের আড়ষ্টতা কাটলে আমেরিকান সুপার মার্কেট থেকেও মাছ কিনতে শুরু করলাম। তবে সুপার মার্কেটের মাছ মূলত ফিলে হিসেবে বিক্রি হয়। হাড় ছাড়া মাংসের মতো কাঁটা ছাড়ানো মাছেও তৃপ্তি নেই। তবু বাংলাদেশী দোকানের বরফের মাছের তুলনায় এ মাছ টাটকা। স্বাদ তাই একটু বেশি।

কাজাখস্তানে দুর্দান্ত ভালো স্যামন পেতাম। সেই মানের স্যামন আমেরিকায় যেসব দোকানে বাজার করি তারা রাখে না। হাফ চামচ তেল দিয়ে কড়ায় বসাতাম। যখন নামাতাম তেল উপচে পড়ত। ওখানেই স্মোকড স্যামন খেলাম প্রথম বার। আর সঙ্গে সঙ্গে যাকে বলে লাভ এট ফার্স্ট বাইট। তবে দুঃখের সাথে জানাচ্ছি ইশিম নদীর নেটিভ মাছ এই টেস্টবাডে সয় নি। বার তিনেক আলাদা আলাদা মাছ নিয়ে এসে খাওয়ার চেষ্টা করে রণে ভঙ্গ দিয়েছি। আশ্চর্যের বিষয় ওরা ফিলেও বেচত না। নিখুঁত কাঁটাওয়ালা মাছ মুখে তোলা যাচ্ছে না। ভাবা যায়!

মেক্সিকোতেও টাটকা কাঁটাসহ মাছ বিক্রি হত সুপার মার্কেটে। বাজারে গেলে নীল কাঁকড়া, মাথাসহ চিংড়ি, কুমড়ো ফুল - কি না মিলতো! আমেরিকায় ফেরত আসার পর মিঠুন যে শহরে থাকতে শুরু করল সেখানে একটি স্বর্গাদপি গরিয়সী চাইনিজ স্টোর ছিল। তারা একোয়ারিয়ামে জীবন্ত তেলাপিয়া আর বাস রাখতো। কমলা ঘিলুওয়ালা চিংড়ি, নীলচে হাঁসের ডিম, তন্বী ফুলকপি - কি না পেয়েছি ওখানে! ফ্রোজেন চাইনিজ মাছও থাকত প্রচুর। মিঠুনের সংশয় অগ্রাহ্য করে কিনে এনেছি এবং ফরিদপুরের উত্তরাধিকার প্রতিবারই মান রেখেছে। ইংইং এর কথা এ প্রসঙ্গে না বললে পাপ হবে। আমার একাডেমিক সিস্টার এই মেয়েটি একটি লক্ষ্মীমন্ত বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছিল যার নেশা ছিল মাছ ধরা। কিন্তু সে মাছ খেতে ভালোবাসতো না। আর ইংইং জানতো না রাঁধতে। সোনার টুকরো ছেলেটা যে কতবার মাছ ধরে, পরিস্কার করে আমায় পাঠিয়েছে!

এবার চাকরি জুটেছে আমেরিকার একটা ছোট্ট গ্রামে। এখানে কোনো চাইনিজ দেবতা নেই। সুপার মার্কেটের চিংড়িগুলো অখাদ্য লাগে। ফিলে করা মাছও তাই। এনিভার্সারির দিন ইলিশ বার করব ভাবছিলাম। গ্রসারী করতে সুপার মার্কেটে গিয়ে গোটা ট্রাউট পেলাম। গ্রিলের অভাবে তাওয়াতেই সেঁকলাম। খেলাম লেবু ছড়িয়ে, অরেঞ্জ সালসা দিয়ে। সাথে র‍্যাস্পবেরী লিকর মার্গারিটা। আনন্দে চোখে জল এল।

সাথের ছবিটা কাল দুপুরের লাঞ্চের। আগের দিন লাঞ্চ মিসের দুঃখ ভুলতে একটা মাছের দোকান খুঁজে সেখানে গেলাম। ছবিতে যে মাছগুলো দেখা যাচ্ছে তার ইংরিজি নাম সারমুলেট। গ্রীকে বলল কুচোমুড়া। তপসে ফ্রাইয়ের মতো লাগলো। সাথে এক প্লেট বেগুন ভাজাও নিয়েছিলাম। সামনে নীল এজিয়ান দুপুরের চড়া আলোয় স্থানে স্থানে তীব্র রূপোলী।

মাছের সাথে ভালোবাসায় যতই জড়িয়ে পড়ছি ততই বুঝছি ভালো মাছের স্বাদ ঠিকঠাক পেতে গেলে তাতে যত কম মশলা দেওয়া যাবে ততই মঙ্গল। ব্যাটারসহ বা শুধুই নুন মাখিয়ে ভাজা অথবা সেঁকা। খাওয়ার সময় লেবু ছড়িয়ে দিলেই চলবে। যদি আঁশটে গন্ধ নিয়ে সংশয় থাকে তাহলে লেবুর রস বা সামান্য রসুনবাটা মাখিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তাহলে বাঙালি মতে রান্না কি বন্ধ? তা নয়। তবে সেখানেও যদ্দুর সম্ভব কম মশলা হলেই ভালো। বাঙালরা সবেতেই কালোজিরে কাঁচালঙ্কা চালাই। সব্জির মধ্যে সীম, বেগুন, বেল পেপার। বিশেষ ক্ষেত্রে ঝিঙে, মূলো, লাউ, কুমড়ো। দয়া করে পেঁয়াজ নয়, যদি না খুব পাকা মাছ হয়। মাছ জিনিসটা এতই স্বাদু ওতে গুচ্ছের পেঁয়াজ রসুন না পড়লেই ভালো। ওগুলো নাহয় মুরগীকে খাদ্যযোগ্য করার জন্য তোলা থাকুক।



Saturday, February 23, 2019

ভেরিনাগঃ হে মোর দুর্ভাগা দেশ

||১||

কাশ্মীরে "নাগ" শব্দটি ব্যবহার হয় জলের উৎস বোঝাতে। শ্রীনগরের দক্ষিণে অনন্তনাগ জেলা, গণনাতীত স্রোতস্বিনীর উৎসসমৃদ্ধ ভুখণ্ড। সেই অসংখ্য নদীরাজির মধ্যে শ্রেষ্ঠতমা ঝিলম, কাশ্মীর উপত্যকার প্রাণধারা, ঋগ্বেদে যিনি বর্ণিত হয়েছেন বিতস্তা নামে। স্বপ্নবিলাসী ভারতীয় কবি তাঁকে কল্পনা করেছেন আদিশক্তি পার্বতীরূপে। শিব বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নীলকুণ্ডে। অভিমানিনী বিতস্তা আপাত উদাসীনতায় নীলকুণ্ড ছেড়ে মাইলখানেক উত্তরপশ্চিমে বিতস্তত্রে প্রকট হলেন। বিরহাতুর মহাকালের স্মরণে নীলকুণ্ডের নাম হল বিরহ-নাগ, অভিশ্রুতিতে ভেরনাগ বা ভেরিনাগ। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর ভেরিনাগের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত প্রস্রবণগুলোকে একত্রিত করে পাথর দিয়ে ঘিরে দিলেন। অঙ্গুরীয়স্থিত নীলকান্তমণির মত সেই অষ্টভুজাকৃতি জলাধারের ছবি দেখামাত্রই বুঝে গেলাম এর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে না পারলে এ আমার মাথা থেকে বেরোবে না।

কাশ্মীর ভ্রমণের প্রধান পরামর্শদাতা রজতকে যখন বললাম ভেরিনাগ যেতে চাই, ও প্রথমে খুব একটা উৎসাহ দিতে পারে নি। অনন্তনাগ জেলা সব সময়েই উত্তপ্ত হয়ে আছে। ভেরিনাগ এককালে জনপ্রিয় টুরিস্টস্পট ছিল। জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের একগুচ্ছ চমৎকার বাংলো এখনও আছে। কিন্তু সময় ক্রমশ কঠিন হয়েছে। দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে শৈশবকে সন্দেহ-পরায়ণতার পাঠ নিতে হয়, যৌবনকে ধ্বংসের অনুরাগী হতে হয়। বুরহান ওয়ানি নামে এক বাইশ বছরের সদ্য যুবক ২০১৬র জুলাইয়ে রাষ্ট্রের সাথে এনকাউন্টারে মারা যায়। ভারতরাষ্ট্রর চোখে সে নাশকতাবাদী জঙ্গী। কাশ্মীরের মানুষের কাছে তার পরিচয় সে স্বাধীনতা সংগ্রামী। শোনা যায় কোনো নিরাপত্তারক্ষীর কাছে মার খেয়ে ২০১০ সালে বুরহান ঘর ছাড়ে। তখন তার পনেরো বছর বয়েস। ভেরিনাগ থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে তার বাড়ী, ত্রাল গ্রামে। মৃত্যুর দিনটাতে সে কাছাকাছিই ছিল, ভেরিনাগের তিরিশ কিলোমিটারের মধ্যে কোকেরনাগের এক গ্রামে। জঙ্গী হলেও ঘরের ছেলে তো ঘরেরই থাকে। সে অসময়ে চলে গেলে অকাল বার্ধক্য গ্রাস করে তার গ্রামকেও। ভেরিনাগ, কোকেরনাগ, অচাবলসহ অনন্তনাগ জেলার বহু পুরোনো টুরিস্ট স্পটই এখন অতীত গরিমা হারিয়ে জবুথবু হয়ে দিন গুজরান করছে কোনমতে। তবু রজত চেয়েছিল আমাদের কাশ্মীরের দিনগুলো ডাল লেকে শিকারাবিহারের অতিরিক্ত কিছু হয়ে উঠুক। আর আমাদের মত রজতেরও অকুণ্ঠ আস্থা মানুষের ওপর, কাশ্মীরিয়তের ওপর। "বসুধৈব কুটম্বকম" মন্ত্রের উত্তরাধিকার এই উপমহাদেশে কাশ্মীরিদের চেয়ে বেশি আর কেউ বহন করছে না বলে রজতের বিশ্বাস। ফিরে এসে আমাদের উপলব্ধিও তদ্রূপ। তাই সব সংশয় দূরে সরিয়ে রেখে জেকেটিডিসির বাংলো রিজার্ভ হয়। আরু উপত্যকায় চারদিন কাটিয়ে আমরা একটা গাড়ি নিয়ে ভেরিনাগের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। পথে পড়বে অচাবল আর কোকেরনাগ।

ভেরিনাগ জাহাঙ্গীরের সৃষ্টি। অচাবল নূর জাহানের। অচাবলেও একটি প্রাকৃতিক প্রস্রবণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে মুঘল গার্ডেন। শ্রীনগর ও অনন্তনাগের যেকটি মুঘল গার্ডেন আমরা দেখলাম তার প্রতিটিতেই ইরানী কায়দায় চার-বাগ তৈরী করার চেষ্টা হয়েছে। মূল ইরানী নকশায়, বাগানের কেন্দ্রে থাকে প্রধান জলাধার। সেখান থেকে যোগ চিহ্নের মত চারটি নালা কেটে বাগানকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়। কাশ্মীরের বাগানগুলো যেহেতু পাহাড়ের ঢালের ওপরে, তাই এগুলোতে মূল জলাধার বাগানের একপ্রান্তে থাকে। সেখান থেকে একটি প্রধান নালা কাটা হয় বাগানের অপরপ্রান্ত পর্যন্ত। তারপর সেই প্রধান নালা থেকে লম্ব বরাবর আরও নালা কাটা হতে থাকে। সাথের ছবিতে ভেরিনাগের মুঘল গার্ডেনের নকশায় ব্যাপারটা ভালো বোঝা যাবে। অচাবলে পৌঁছেছিলাম সাড়ে এগারোটা নাগাদ। আমরাই একমাত্র বহিরাগত। তিনচার জন কিশোর ফোয়ারার জলে হুটোপুটি করছিল। বাগানের মাঝবরাবর একটি বরাদরি (মণ্ডপ) আছে। সাদা টুপি মাথায় একজন ইমাম গোছের মানুষ একটি বাদামী ফিরন পরা অল্পবয়েসী ছেলের সাথে সেখানে বসে বিশ্রম্ভালাপ করছিলেন। বাগানের শেষ প্রান্তে মূল প্রস্রবণ ও তৎসংলগ্ন হামাম। সময়টা মে মাস। সদ্য গ্রীষ্ম এসেছে। বাগানজুড়ে অজস্র গোলাপ। চিনার গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। প্রায় জনবিরল বাগানের চবুতরায় বসে নূর জাহান বেগমের মেধা ও নিঃসঙ্গতাকে ছোঁয়া যাচ্ছিল। বেরোনোর সময় মাটিতে পড়ে থাকা ক`টি চিনার পাতা কুড়িয়ে নিলাম।

||২||

কোকেরনাগের বাগানটা মুঘলদের বানানো নয়। পাহাড়ি ঝরনা থেকে জল এসে যেখানে জমেছে তার আকৃতি মুরগির নখের মত। মুরগি অর্থাৎ কুক্কুট (কুঁকড়া) থেকে এই জায়গার নাম কোকেরনাগ। বাগান বাদ দিলেও জায়গাটা ট্রাউট চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানেও আমরা ছাড়া কোন ট্যুরিস্ট নেই। কিছু মানুষ গোল হয়ে বসে গল্প করছেন। বাগানের ভিতরের দিকে স্ফটিকস্বচ্ছ জলের ওপর একখানি বাঁকা ব্রিজ। একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার দেখা মিলল সেখানে। তাদের নির্জন মূহুর্তটিতে বাধা না দিয়ে আমরা সন্তর্পণে বেরিয়ে এলাম। বাদাম গাছে ঝেঁপে ফুল এসেছে। গাছের তলায় একটু দাঁড়িয়েছিলাম। হালকা গোলাপী ফুল টুপটাপ ঝরেই চলেছে। তাদের সংগ্রহ করি। নখপ্রান্তে ঈষৎ হরিদ্রাভ পরাগরেণু লেগে থাকে।

কিছু স্ন্যাকস কিনে বাগানের বাইরে এসে দেখি ড্রাইভার আসিফ ভাই একজনের সাথে গল্প জুড়েছে। আসিফ একেবারেই বাচ্চা ছেলে, কুড়ি-বাইশ বছরের। নতুন ছেলেটিও তেমনই হবে। আমরা ভেরিনাগ যাচ্ছি শুনে সে বলল – “আমার দাদা তারিক ভেরিনাগের গেস্টহাউসেই কাজ করে। আমি বলে রাখছি দাদাকে তোমরা যাচ্ছ এখন।“ আমরা ওকে সেই সাথে খাবার ব্যবস্থাও করে রাখতে বলে গাড়িতে উঠলাম। ভেরিনাগ খুব বেশি দূর নয় কোকেরনাগ থেকে। কিন্তু রাস্তা পাহাড়ী এবং সরু। আসিফ বলছিল এখানেই কোনো এক জায়গায় বুরহান ওয়ানিকে মারা হয়। কাশ্মীর উপত্যকা আপাত স্থিতাবস্থা থেকে আবার অশান্ত হয়ে উঠেছিল বুরহানের মৃত্যুর পরে। ঘরের ছেলের মৃত্যুতে রেগে গিয়ে সাধারণ মানুষ পাথর ছুঁড়েছে আর্মির দিকে। আর্মিও নির্বিচারে পেলেট গান চালিয়ে জখম করেছে শত শত মানুষকে। বিগত পনেরো দিনে যখনই কোনো সেনা বা আধাসামরিক কর্মীর সাথে কথা হয়েছে, তাঁরা বলেছেন, কবে এখান থেকে বদলী হব তার আশায় আছি। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান থেকে আসা এই মানুষেরা কাশ্মীরিদের নিজেদের দেশের মানুষ ভাবতে পারেন না। কাশ্মীরিরাও এঁদের বহিরাগত শত্রু মনে করেন।

ভেরিনাগের সরকারী টুরিস্ট্লজে পৌঁছতে পৌঁছতে আড়াইটে বেজে গেল। সার দেওয় ছয়টি বাংলো। জনা চারেক ছেলে বাংলোর সামনের লনে গুলতানি করছিল। লন থেকেই মুঘল গার্ডেন দেখা যাচ্ছে। তারিক আমাদের ঘর খুলে দিল। বলল – “আমি তোমাদের জন্য ডাল-ভাত রান্না করে রেখেছি। এর বেশি আমি পারি না। বিকেলে ওস্তাদ আসবে। তোমরা মুরগি খেতে চাও তো বল।” আমরা আসিফকে বললাম – “তোমার তো আজ শ্রীনগর ফেরা হবে না। তুমিও খেয়ে নাও আমাদের সাথে।“ আসিফ কিছুতেই রাজি হল না। কাছেই তার এক বন্ধু থাকে। তার সাথে কাটাবে সন্ধ্যাটা। খাবার ঘরে গিয়ে আইয়ুব ভাইয়ের সাথে আলাপ হল। মাঝবয়েসী ভদ্রলোক সামান্য খুঁড়িয়ে চলেন। বানিহালের সরকারী টুরিস্টলজে ওয়েটারের চাকরী করেন। ভেরিনাগে যেহেতু বহুদিন কোন লোক আসে না, তাই একা তারিকই ভেরিনাগ সামাল দেয়। আমরা আসব বলে বানিহাল থেকে আইয়ুব ভাইকে পাঠানো হয়েছে। আইয়ুব ভাইয়ের বৌ-মেয়ে ভেরিনাগে থাকে। বিজনেস ট্রিপে ঘরে ফেরাটাও জুড়ে দিতে পারলে সবারই আনন্দ হয়। আইয়ুব ভাইও ব্যতিক্রম নন।

তারিকের যারপরনাই খারাপ রান্না খেয়ে আমরা বাগানের দিকে রওনা হলাম। খাবারের পরিমান বেশ কম। কেউ আসে না। চাল-ডাল বাড়ন্ত। আইয়ুব ভাই বাগানের গেট পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিয়ে বাজারে গেলেন মুরগি আনতে। বাগানে অনেক লোক। তবে টুরিস্ট বলতে আমরাই। যে নীলকান্তমণির স্বপ্ন দেখে এতদূর ছুটে এসেছি তার কাছে যাওয়ার আগেই চিনার গাছের নিচে একটি শিবমন্দির চোখে পড়ল। মন্দিরের দরজায় তালা দেওয়া। তবে উঁকি মেরে দেখতে পেলাম শিবলিঙ্গে ফুল ছড়ানো আছে। ফুলগুলি তাজা।

শিবমন্দিরের সামনে জলের নালা। তারপর একটি খিলান পেরোলেই সেই সবুজাভ নীল অবিশ্বাস্য জলাধার। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন, এই জল এত স্বচ্ছ যে একটা পোস্তদানাকেও দেখা যায় যতক্ষণ না সে অতল স্পর্শ করে। জলে অনেক মাছ খেলা করছে। লোকজন মুড়ি খাওয়াচ্ছে মাছকে। আমরা বাদে সবাই স্থানীয় মানুষ। অষ্টভুজাকৃতি জলাধারকে ঘিরে চব্বিশটি তোরণ। আমরা ডানদিক ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। খুব সম্ভব তৃতীয় তোরণে আরো একটি শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গের পিছনে তোরণের দেওয়ালে মাতৃমূর্তি। আইন-ই-আকবরীতে ভেরিনাগ অঞ্চলে হিন্দু মন্দির ও গুহার উল্লেখ আছে। এই মাতৃমূর্তি সে সময়ের কিনা জানা নেই, তবে দেখে মনে হয় বেশ প্রাচীন। এখানেও তাজা ফুল দেখতে পেলাম। আরো ক'টি তোরণ পেরোলে পশ্চিম দেওয়ালে দেখা যায় একটি পাথরের ফলক। তাতে ফার্সীতে লেখা আছে হায়দার নামে স্থপতি শাহজাহানের নির্দেশে ১০৩৭ হিজরিতে এই জলপ্রণালী নির্মান করেন। আরো একটি ফার্সীতে লেখা পাথরের ফলক পাওয়া যায় দক্ষিণ দেওয়ালে। সেটা থেকে জানা যাচ্ছে ১০২৯ হিজরিতে আকবরের ছেলে নুর-উদ-দিন জাহাঙ্গীর তাঁর রাজত্বের পঞ্চদশ বছরে ভেরিনাগে আসেন এবং এই জলাধার তৈরী করেন। জাহাঙ্গীরের শুরু করা কাজ তাঁর ছেলে শাহজাহান শেষ করেছিলেন বোঝা যাচ্ছে। আরও শোনা যায়, ভেরিনাগ জাহাঙ্গীরকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তাঁর বাসনা ছিল এখানে সমাধিস্থ হওয়ার, যদিও সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পূর্ব দেওয়ালে চলে আসি। চারশো বছরের পুরোনো কোন প্রাচীন লিপি এই দেওয়ালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়ত এই দেওয়ালে যা দেখে এসেছি তা আর ক'মাস পর মুছেও যাবে। তবুও পাথরের ওপর চকখড়ি দিয়ে লেখা বুরহান নামটা বুকের ভেতর ধাক্কা দিল। "দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে নায়কের প্রয়োজন হয়"। দুর্ভাগা সেই দেশ যে দেশের কিশোর সন্ত্রাসবাদী হয়।


|
||৩||

বাগান থেকে ফিরে দেখলাম বাজার এসেছে। আইয়ুব ভাই আর তারিক একটা খাতায় সব জিনিসপত্র এন্ট্রি করাচ্ছেন। আইয়ুব ভাই জিজ্ঞেস করলেন - "চা খাবেন নাকি?" আমরা জানালাম চা পেলে মন্দ হয়না। তারিক চা বসালো। যিনি মুরগি রাঁধবেন সেই ওস্তাদ তখনও আসেন নি। শুনলাম নিচের কোন গ্রাম থেকে এসে রান্না করে আবার ফিরে যাবেন তিনি। কাঁচ ঘেরা ডাইনিং হলে চা-বিস্কুট নিয়ে বসলাম আমরা। একটু পরে আইয়ুব ভাই এসে যোগ দিলেন। আমাদের ইচ্ছা ছিল কিছুটা রাস্তা অন্তত পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করার। শ্রীনগরে অটো নিয়ে ঘুরেছি। কিন্তু লম্বা জার্নিগুলোর প্রতিটাতেই পথে একাধিক জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় প্রাইভেট কার নিতে বাধ্য হচ্ছিলাম। ভেরিনাগে একরাত থেকে পরের দিন বিকেলে জম্মু থেকে ট্রেন ধরার কথা। মাঝে কোথাও দাঁড়ানোর নেই। এই পথটা পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট নেওয়া যেতেই পারে। আইয়ুব ভাই কিছু সুলুক সন্ধান দিলেন। সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন হিলার। ভোরে বাজার থেকে শেয়ারের জিপ ছাড়ে স্টেশনের দিকে। হিলার থেকে ট্রেন ধরে বানিহাল। তারপর বানিহাল থেকে বাস অথবা শেয়ারের জিপ পাওয়া যাবে জম্মুর জন্য। পরামর্শ মনে ধরল। ইতিমধ্যে তারিক এসে গেছে। তারিকের ইচ্ছা আমরা ওর ভাইয়ের গাড়ি রিজার্ভ করে জম্মু যাই। ও বারবার বলতে লাগল, তোমাদের এভাবে ভেঙে ভেঙে যাওয়ার অভ্যেস নেই, তোমরা পারবে না। আমরা সেকথায় পাত্তা দিলাম না। হিলার থেকে ভোরের ট্রেন কখন ছাড়ে সেটা আইয়ুব বলতে পারলেন না। আমাদের কাছে না আছে টাইমটেবল, না আছে ইন্টারনেট। খোঁজখবর করতে বাজারে যাওয়া মনস্থ করলাম। আইয়ুব বলে দিলেন বাগানের মধ্যে দিয়ে কিভাবে শর্টকাটে বাজারে যেতে হবে। দুপুরে বাগানে ঢোকার জন্য যে টিকিট কেটেছিলাম সেটা দেখিয়েই বিকেলেও বাগানের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করা যাবে জানা গেল।



আবারও একবার বাগানে ঢোকার সুযোগ পেয়ে বেশ ভালোই লাগল। বিকেলবেলা অনেক মানুষ বাগানে এসেছেন। জলপ্রণালীর দুধারে সারি দিয়ে গোলাপ বাগান। তার সামনে পাথরের বেঞ্চি। সন্ধ্যা নামার আগের উষ্ণতাটুকু শুষে নিচ্ছে অশান্ত উপত্যকা। জলধারা যেখানে নদী হয়ে শহরে পড়েছে বাগানের সেই প্রান্তে কার্পেট ধুচ্ছে দুই অল্পবয়েসী ছেলে। তাদের পেরিয়ে শহরে ঢুকছি, দেখি একজন মানুষ সিঙারা ভাজছেন। ট্রেনের কথা জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না, তবে জিপ স্ট্যান্ডের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। জিপওয়ালারা নিশ্চয়ই ট্রেনের টাইম জানবে। কাশ্মীরের অন্য শহরগুলোর মতই বেশ পরিস্কার রাস্তা। একটা মুদির দোকানের সামনে বসে এক ভদ্রলোক দোকানীর সাথে গল্প করছিলেন। আমাদের দেখে হাসলেন। জানতে চাইলেন কোথা থেকে আসছি। আমরা তাঁর কাছেও ট্রেনের কথা জানতে চাইলাম। দোকানী বললেন - "আমি তো টাইম জানি না, তবে চিন্তার কিছু নেই, এক্ষুনি ফোন করে জেনে দিচ্ছি।" আমরা ভাবিনি দুই অপরিচিত পথচারী, যারা তাঁর দোকান থেকে কিছু কেনেও নি তাদের জন্য উনি ফোন করে কাউকে দিয়ে টাইমটেবিল ঘাঁটাবেন। জানা গেল সোয়া সাতটায় একটা ট্রেন আছে। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে আসছি, বাইরের বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন – “আমার বাড়ি কাছেই, চা খেয়ে যান।“ আতিথ্য নেওয়ার লোভ হচ্ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে না করতে হল। জিপ স্ট্যান্ডেও একটা নেমন্তন্ন পেয়ে গেলাম। জিপওয়ালার কাছে জানতে চাইলাম সকালের ট্রেন ধরার জন্য কখন আসতে হবে, তিনি টুরিস্ট দেখে খুব খুশি হয়ে গল্প জুড়লেন। তাঁরও বাড়ি কাছেই। চা খাওয়াতে চাইলেন। বললেন চা খাইয়ে নিজের গাড়িতে করে গেস্ট হাউসে পৌঁছে দেবেন। তাঁকেও ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে ফিরে এলাম। বাগানে ঢোকার মুখে সেই সিঙারওয়ালার সাথে দেখা। তিনি তখন ঝাঁপ তুলছিলেন। আমাদের দেখে জানতে চাইলেন সব খোঁজ পেয়েছি কিনা। সন্ধ্যা ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছিল। বাংলোয় ফিরে দেখি ওস্তাদ এসে গেছেন। তবে কারেন্ট অফ। রান্না হচ্ছে এমার্জেন্সি লাইটে।

||৪||

ডাইনিং হলে মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা বসলাম। নিচের শহরে আলো আছে। পাওয়ার অফ শুধু গেস্ট হাউসেই। তারিক গল্প করছিল। নব্বইয়ের টালমাটাল সময়ে গেস্টহাউসে আগুন ধরিয়ে দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। হতাহত হয় নি কেউ। তবে ডাইনিং হল বাদে বাকি সব পুড়ে গেছিল। যে ছ'টা বাংলোর একটায় আমরা থাকছি সেগুলো সব নতুন তৈরী। তারিককে জিজ্ঞেস করলাম এখন এলাকার অবস্থা কেমন। আসিফ যা বলেছিল তারিকও তাই বলল। বুরহান ওয়ানি মারা যাওয়ার পর পঁয়তাল্লিশ দিন কার্ফিউ ছিল। জনতা পাত্থরবাজি করেছে। পুলিশও নির্মম ভাবে তার উত্তর দিয়েছে। এখন পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল। কিন্তু শান্তি আসবে এমন আশা কেউই আর করে না। শ্রীনগর, সোনমার্গ, পহেলগাম অঞ্চলে তবু টুরিস্টের আনাগোনা আছে এখনও। কিন্তু অনন্তনাগ সেটাও হারিয়েছে। আরু উপত্যকায় যাওয়ার পথে মার্তন্ড সূর্যমন্দিরে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা। হায়্দার সিনেমার একটা গানের শুটিং হয়েছিল এই মন্দিরে। আমার ধারনা ছিল হয়তো সে কারণেও ওখানে কিছু ভীড় থাকবে। কিন্তু সেখানেও আমরাই একমাত্র টুরিস্ট। দুজন মানুষ মন্দিরের চাতালে বসে গল্প করছিলেন। তাদের মধ্যে একজন আমাদের দেখে বললেন - "আমি গাইডের কাজ করি, আপনাদের মন্দির দেখিয়ে দেব।" খুব যত্ন নিয়ে ঘোরালেন। ড্রাইভার আসিফের কাছে জানতে চাইলাম,
- "এখানে আসো না টুরিস্ট নিয়ে?"
সে বলল - "না তো, তোমরা এর সন্ধান পেলে কি করে তাই ভাবছি। আমরা ছোটবেলায় এখানে খেলতে এসেছি। হিন্দুদের কি মন্দির জানি না। পান্ডবেরা এইসব বড় বড় পাথর এনে এখানে রেখেছে, এই আমরা শুনেছি। আমরা একে পান্ড্বল্বাদেন বলি।"
- "এখন তো টুরিস্ট নিয়ে আরু-পহেলগাম-শ্রীনগর করছ। অফ সিজনে কি করবে আসিফ?"
- "মধ্যপ্রদেশে একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করি, শীতে সেখানে চলে যাব।"
তারিক, আইয়ুব ভাইদের মত যারা সরকারী চাকরী করে, তাদের বাদ দিলে টুরিজমের সাথে যুক্ত বহু মানুষের এভাবেই বছর চলে।

গল্প করতে করতে ওস্তাদের রান্না হয়ে গেছে। ওস্তাদের নাম ফৈয়জ ভাই। রেঁধেছেন চিকেন তেহরাওয়ালা। গর্বভরে এক টুকরো মাংস আর ঝোল আমাদের টেস্ট করতে দিলেন। সত্যি বলতে কি দশে ছ'য়ের বেশি ওনার প্রাপ্য হয়না, তবে যেভাবে তাকিয়েছিলেন তাতে দশের কম দিতে সাহস পেলাম না। ভদ্রতাভরে রেসিপিও জেনে নিলাম। ভুলে গেছি যদিও। ইতিমধ্যে আলো এসেছে। আইয়ুব ভাই তার মেয়ের ছবি দেখালেন মোবাইলে। স্কুলে পড়ছে মেয়ে।
- "কলেজে পাঠাবেন তো আইয়ুব ভাই?"
- "নিশ্চয়ই পাঠাবো। যতদূর চায় পড়বে।"
মনে পড়ল নার্গিস আর শবনমের কথা। কার্গিল থেকে সাংকো গ্রামে গেছিলাম তিরিশ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি দেখতে। বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভেঙে ফেলার পর পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অতিকায় বুদ্ধ আর তিনটে পড়ে রয়েছে পৃথিবীতে। তিনটেই লেহ অঞ্চলে। ফেরার পথে দেখলাম দুটো মেয়ে ব্যাকপ্যাক কাঁধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়ি দেখে হাত দেখাল। ড্রাইভারকে বললাম তুলে নিতে। দুজনেই কলেজে পড়ে। একজন আর্টস। অন্যজন সায়েন্স। জিজ্ঞেস করলাম কলেজ শেষ করে চাকরিবাকরি করবে কিনা। বলল,
- "এখানে তো তেমন সুবিধে নেই। বাবা-মা বাইরে ছাড়বে না। জানোই তো কাশ্মীরের অবস্থা। তবু দেখি চেষ্টা করে।"
- "দ্যাখো হয়ত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের আর কতদিন বাকি যেন?"
- "সেটাও তো জানি না ঠিক করে। এখানে অনেক সময় পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায় ঝামেলার জন্য। এভাবে কত স্টুডেন্টের যে বছর নষ্ট হয়েছে! কে জানে আমাদের কি হবে!"
ভেরিনাগ আসার আগে আরু গ্রামে ছিলাম ক'দিন। সেখানে একটাই স্কুল। স্কুলের এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন এখন বাবা-মায়েরা ভয় পায় ছেলেমেয়েকে শহরের কলেজে পাঠাতে। বিশেষ করে ছেলেদের নিয়ে বেশি ভয়। পাছে কলেজে গিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। কেই বা চায় তার সন্তান মৃত্যুভয় নিয়ে ঘুরুক! কিছুদিন আগে কোন রিটায়ার্ড জেনারেলের সাথে এই শিক্ষকের কথা হচ্ছিল। জেনারেল বেড়াতে এসেছেন আরুতে। দেখেন ঘোড়াওলা ছেলেটি ভারী সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান, ঝরঝরে ইংরিজিতে কথা বলছে। শিক্ষকের কাছে ছেলেটি সম্পর্কে জানতে চান। সে ছেলে বোর্ড পরীক্ষায় পহেলগাম তহশিলে প্রথম হয়েছিল। তারপরে আর পড়ে নি। আরুর স্কুলে সাকুল্যে চারজন মাস্টারমশাই। দুজন উর্দু। বাকি দুজন ইতিহাস-ভূগোল ইত্যাদি। অঙ্ক, ইংরিজি এবং বিজ্ঞানের কোন শিক্ষক নেই। আরুতে যে চারদিন ছিলাম, রোজ সন্ধ্যায় আমাদের গেস্টহাউজের সামনের মাঠে ঘোড়াওলা ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখতাম। তাদের বেশিরভাগই টুরিস্টদের সাথে কথা বলতে বলতেই দিব্যি ইংরিজি শিখে ফেলেছে। ব্যবহার অত্যন্ত ভদ্র। ভারতের যে কোন স্কুল এই ছেলেদের ছাত্র হিসেবে পেলে গর্বিত হবে।

ইতিমধ্যে তারিক খবর এনেছে পরের দিন ট্রেনের স্ট্রাইক। হিলার থেকে ট্রেনে বানিহাল যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করতে হল। তারিক চাইছিল আমরা ওর ভাইয়ের গাড়িতে যাই। কিন্তু আমাদের পাব্লিক ট্রান্সপোর্টের বাসনা প্রবল। আইয়ুব ভাই বললেন জিপস্ট্যান্ড থেকে শেয়ারের জিপ বানিহাল যায়। সকালে সেই জিপে তুলে দেবেন আমাদের। ওদিকে মুরগি ঠান্ডা হচ্ছিল। খালিপেটে বকবক করার চেয়ে চারজনে খেতে খেতে গল্প করার প্রস্তাব সকলেরই পছন্দ হল। খাওয়া শেষ হতে না হতে আবার লোডশেডিং। আইয়ুব ভাই গোটা চারেক মোমবাতি দিয়ে বললেন রাতে আলো নাও আসতে পারে। অন্ধকারে সারি দেওয়া ছ'টি বাংলো। সবার শেষেরটি আমাদের। বাংলোর পিছনে ঘন জঙ্গল। মাথার ওপর ঝকঝক করছে তারা। ঘরে এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিজেদের দীর্ঘ ছায়াগুলো দেখে কেমন গা ছমছম করল। হঠাৎ করে মনে পড়ল তারিক বলছিল নব্বইতে এই বাংলো পুড়িয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসবাদীরা। আমরা মেনল্যান্ড ইন্ডিয়ার লোক। আমাদের রাজ্য, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য থেকে সেনা পোস্টিং হয় এখানে। তাদের পেলেট গানে অন্ধ হয়েছে এমন ছেলের কথা একটু আগেই তারিকের মুখে শুনেছি। তারা যদি সেই অপরাধের জন্য আমাদের শাস্তি দিতে চায়? মনের ভাব মুখে আনার আগেই লজ্জা পেলাম। মাত্র ক'ঘন্টা আগে বাজারে গিয়ে অভাবনীয় আতিথেয়তা পেয়েছি। পাঁচ মিনিটের পরিচয়ে মানুষ চায়ের নেমন্তন্ন করেছে। মূলত ব্যবসাসূত্রে স্মরণাতীত কাল থেকে কাশ্মীরে নানা জাতি, নানা ধর্মের মানুষের আনাগোনা। এখানকার মানুষ মিষ্টভাষী, আন্তরিক, আমুদে। রাজনৈতিক দুর্যোগ এ অঞ্চলে এই প্রথম নয়। স্বাধীনতার আগেও অত্যাচারী মুসলিম শাসক, হিন্দু শাসক এই উপত্যকাকে শোষন করেছে ক্রমান্বয়ে। সাতচল্লিশে দেশভাগের সময় কাশ্মীর চেয়েছিল একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে। ভারত বা পাকিস্তান কারোর সাথেই সে যেতে চায়নি। তারপর কি হল, সে আলোচনার উপযুক্ত স্থান এই লেখা নয়। গত তিরিশ বছর ধরে অশান্তির আগুন নেভার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মূলত ব্যবসা নির্ভর অতিথিবৎসল একটি জাতি ক্রমশঃ তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। শ্রীনগরে থাকাকালীন সেখানকার পুরোনো মসজিদগুলো আমরা ঘুরে দেখেছিলাম। শাহ-এ-হমদিন, মাখদুম সাহিব, আখুন্দ-মুল্লা-শাহর মত সুফি সাধকদের উত্তরধিকার বহন করছে এই অনবদ্য স্থাপত্যগুলি। সেই উদার সুফি ইসলামের পীঠস্থান কাশ্মীর ক্রমশ চরমপন্থী রক্ষণশীল ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। নেহেরুর প্রতিশ্রুত গণভোট দেশভাগের সত্তর বছর পরেও হয়নি। কোনদিন হবে এমনও আশা নেই। জওহর টানেলের দক্ষিণে ভারতের মূল ভূখণ্ডের মানুষ একরাশ ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। এদিকের মানুষও তাই। এমনকি আমিও, পনেরো দিন ধরে কাশ্মিরী আতিথেয়তা গ্রহণের পরেও অন্ধকার জনশূন্য বাংলোয় ভয় পেয়েছি একটু আগেও। দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে সহনাগরিকের প্রতি অবিশ্বাস বুকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

পরের দিন ভোরে বাজারে গিয়ে শেয়ারের জিপ ধরি। আইয়ুব ভাই সাথে আসেন। আসার পথে ভেরিনাগের বাগান থেকেও একটি চিনার পাতা তুলে নিই। আমার বইয়ের ভাঁজে জাহাঙ্গীর ও নূর জাহানের দুই বাগানের দুটি পাতা পাশাপাশি শুয়ে থাকে। ব্যক্তিজীবনে এ ব্যবস্থা তাঁদের পছন্দ হত কিনা জানার কোন উপায় নেই। ইতিহাস তো মনের খোঁজ রাখে না। আজ থেকে পাঁচশো বছর পরে এই দিনগুলো সম্পর্কে ইতিহাস বইতে ক'লাইন লেখা থাকবে কল্পনা করার চেষ্টা করি। পঁয়ষট্টি, একাত্তর, নিরানব্বইয়ের যুদ্ধের কথা তো থাকবে জানি। কার্গিলের ছাত্রীটির কথা লেখা হবে কি? পরীক্ষা পাশ করা নয়, ঠিক সময়ে পরীক্ষা হবে কিনা নিয়ে যার সংশয় ছিল? অথবা আরুর সেই ঘোড়াওলা ছেলে? বোর্ড পরীক্ষায় খুব ভালো করেও যাকে কলেজে পাঠানোর সাহস পেল না তার বাপ-মা? ভেরিনাগের মানুষগুলো, যারা যতটুকু সময় রইলাম অকুণ্ঠ আতিথেয়তা দিল, যদিও তাদের চোখে আমি সেই অঞ্চলের মানুষ যেখানকার লোকেরা যখন তখন তাদের ঘর থেকে বার করে চিরুনীতল্লাসী করতে পারে? ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠা ভারতে আসিফ কি পারবে সামনের শীতেও মধ্যপ্রদেশে গিয়ে কাজ করতে? মুঘল বাগানের ভিতরে থাকা প্রাচীন মাতৃমূর্তি, যাকে ২০১৮তেও পুজো পেতে দেখে এসেছি, অসহিষ্ণু সময় তাকে কি উৎপাটন করবে তার সহস্রাধিক বছরের আসন থেকে? বাইরে বেরোলে, মানুষকে দেখলে বোঝা যায় কত সহজেই আমরা নিজেদের মনগড়া ভাবনায় রাশি রাশি শত্রু বানিয়ে রাখি। অন্নসংস্থান আর সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার - এর বেশি মানুষ আর কি চায়? এটুকু পেলে কোন মূর্খ নিজের জীবন-যৌবন বিসর্জন দেয়? আর এটুকু যে পেল না, সে প্রতিবাদ করবে না এমন আশাই বা করে কোন মূর্খের স্বর্গের বাসিন্দা? সত্যদ্রষ্টা ঋষির ভবিষ্যৎবাণী মনে করে ভয় হয় - "সবারে না যদি ডাক, এখনো সরিয়া থাক, আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান- মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।"